বিজ্ঞাপন

পীর শামীম হত্যা

সাবেক শিবির নেতাকে প্রধান আসামি করে ৪ জনের নামে মামলা

অ+
অ-
সাবেক শিবির নেতাকে প্রধান আসামি করে ৪ জনের নামে মামলা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ফিলিপনগরে দরবার শরীফে হামলা চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে পীর শামীম জাহাঙ্গীরকে হত্যার অভিযোগে হত্যা মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় নিহত পীরের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। এ সময় তার সাথে দুই ভাই গোলাম রহমান এবং হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন, ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কালাম দফাদারের ছেলে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য মুহাম্মদ খাজা আহমেদ (৩৮), একই ইউনিয়নের হোসেনাবাদ বিশ্বাসপাড়া গ্রামের মৃত এরশাদ আলীর ছেলে খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা সভাপতি মো. আসাদুজ্জামান (৩৫), পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের গাজী মিস্ত্রির ছেলে স্থানীয় জামায়াত কর্মী রাজীব মিস্ত্রি (৪৫) ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক ইসলামপুর পূর্বপাড়া গ্রামের মো. শিহাব।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজীবকে জামায়াতের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় দেখা গেছে। তিনি সাবেক শিবির নেতা খাজার অনুসারী।

মামলার এজাহারে অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান উল্লেখ করেছেন, তার ছোট ভাই মো. আবদুর রহমানের (৫৭) ফিলিপনগরে নিজ বাড়িতে দরবার শরিফ আছে। শনিবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে তার ভাই বাড়িতে অবস্থিত দরবারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় আসামি মুহাম্মদ খাজা আহমেদের হুকুমে এজাহারভুক্ত আসামিরা অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জন সংঘবদ্ধ হয়ে হাতে লোহার রড, হাঁসুয়া, দা, ছুরি, কুড়াল, বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম নিয়ে দরবার শরিফে অনধিকার প্রবেশ করে। দরবারের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। ৩ নম্বর আসামি রাজীবসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা দরবার শরিফের দ্বিতীয় তলায় প্রবেশ করে জোবায়ের (৩১) নামের একজনকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এরপর আসামি রাজীব মিস্ত্রি লোহার রড দিয়ে আবদুর রহমানের কোমর বরাবর এবং হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাত করেন। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানকে এলোপাতাড়িভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার ওপর, ডান চোয়ালের কাছে, ঠোঁটের মধ্যে, থুঁতনিতে, পিঠের বাঁ পাশে ও ডান পায়ের হাঁটুর পেছনে কুপিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করেন এবং বাঁশের লাঠি ও কাঠের বাটাম দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়িভাবে মারধর করেন। আবদুর রহমানের চিৎকারে দরবার শরিফের পরিচালিকা জামিরন দৌঁড়ে যান। ২ নম্বর আসামি আসাদুজ্জামান তাকেও হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় কোপ মারিতে গেলে কোপটি বাঁ হাত দিয়ে ঠেকালে বাঁ হাতের কবজির ওপরের অংশের মাংস কেটে রক্তাক্ত জখম হয়।

বিজ্ঞাপন

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা দরবার শরিফ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আনুমানিক ২০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করে। অজ্ঞাতনামা আসামিরা আবদুর রহমানের দরবার শরিফে থাকা স্টিলের আলমারি ভেঙে ৫ লাখ টাকা এবং ৪ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে।

মামলার বিষয়ে জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি ও  দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য খাজা আহমেদ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার গোপনে বা প্রকাশ্য কোন ধরণের দায়বদ্ধতা নেই। আমাকে জড়ানোর মূল উদ্দেশ্য আমি এই এলাকার চেয়ারম্যান ক্যান্ডিডেট। আমি যেন এই এলাকার মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, আমি যেন এই ফিলিপনগর থেকে দূরে চলে যাই, এটাই হচ্ছে মূল টার্গেট। এটার সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। এখানে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য আমাকে এই ঘটনায় জড়ানো হয়েছে। প্রশাসনকে বুঝিয়েছে আমি এটার মদদদাতা।

খাজা আহমেদ বলেন, এখানে উভয় সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমি আগে পরে কোথাও ছিলাম না। সেদিন যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ওইখানে সেদিন হামলা করার কথা ছিল না। আমি যতটুকু জানতাম দুপুর ২টার সময় আবেদের ঘাট নামক স্থানে স্থানীয় সবাই বসে প্রশাসনের মাধ্যমে কীভাবে সমাধান করা যায় সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ছিল। সেখানে আমাকে যেতে বলা হয়েছিল, আমি বলেছি আমি যাব না। কিন্তু তারা সেখানে না বসে লাঠি-সোটা নিয়ে দরবারে গিয়ে হামলা করে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমি ওই হামলার সময় সশরীরে কোনভাবেই সেখানে ছিলাম না। সেখানে থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। যখন ওই ঘটনা ঘটেছে তখন আমি প্রশাসনের সাথে ফোনে কথা বলছিলাম। ওই ঘটনার পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাৎক্ষণিক আমি আমি হাসপাতালে যাই। কারণ, সে আমার বংশের। হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করলে কাগজপত্র রেডি করে আমি থানায় যাই। আমি নিজে তার লাশ মর্গে পাঠাই। কুষ্টিয়া এসে আমিই লাশ রিসিভ করি।

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে এমন করা হয়েছে । আমাকে জড়ানোর সাথে সাথে বিভিন্ন ডকুমেন্ট অনলাইন থেকে গায়েব করে ফেলা হয়েছে। আমি সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। কারা কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, কে ছুরি হাতে ছিল, কে রামদা হাতে ছিল, কে লাঠি হাতে ছিল সব বেরিয়ে আসবে। এ ঘটনার আগে কোথায় মিটিং হয়েছিল ৪০ মিনিটের সেই তথ্য আমার কাছে দ্রুত চলে আসবে।

আমি আবারও বলছি, রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নামে এই মামলা করা হয়েছে।

মামলার আরেক আসামি খেলাফত মজলিসের উপজেলা আমির মাওলানা আসাদুজ্জামান আসাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য একাধিকবার ফোন দিলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া অনেককে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। দরবারে হামলার ঘটনার পর হামলাকারীরা অনেকেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।

দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, হত্যা মামলায় এখনও পর্যন্ত কোন আসামি আটক নেই। সোমবার রাতে নিহতের ভাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আমরা তদন্ত ও সকল কিছু পর্যালোচনা করছি। আসামি ধরতে আমাদের অভিযান অব্যহত আছে।

দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতি :

পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় সাবেক শিবির কর্মী ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্যকে জড়িয়ে কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাত ৮ টায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানান দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মো. বেলাল উদ্দীন এবং সেক্রেটারি ডা. মো. আব্দুল্লাহ আল নোমান।

বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিপনগরের ঘটনা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ নয়। এমনকি এর সঙ্গে জড়িত কেউ রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী নয়। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আকস্মিকভাবে ঘটেছে। এটি রাজনৈতিক কোন পরিকল্পনার অংশ নয়। তবুও বিষয়টিতে একটি রাজনৈতিক মহলের ইন্ধনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে বলে আমরা মনে করছি।

জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর কোন নেতা বা কর্মী জড়িত নেই। একই সাথে সঠিক তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দাবী করছি।

তারা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পাশাপাশি, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে সংবাদ প্রত্যাহার ও সংশোধনের আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে শামীম জাহাঙ্গীর নামের এক পীরের আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী। এ সময় পীর শামীম জাহাঙ্গীর ও তার অনুসারীদের বেধড়ক মারধর করেন তারা। এই ঘটনায় পীর শামীমকে আহত অবস্থায় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকাল ৪টায় মারা যান তিনি।

রোববার দুপুরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়না তদন্ত সম্পন্ন করে সাড়ে পাঁচটার দিকে ফিলিপনগর এলাকার পশ্চিম-দক্ষিণ কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

রবিউল আলম ইভান/এনটি

বিজ্ঞাপন