নদীভাঙন থেকে রক্ষা করা ঘরটিই এখন শিক্ষার্থীদের ভরসা

Dhaka Post Desk

মাহমুদ আল হাসান রাফিন, নীলফামারী

১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:২৯ পিএম


যতদূর চোখ যায় তিস্তা নদীর বিশাল জলরাশি। ওপরে বিস্তৃর্ণ আকাশ। একটু পর পর আসছে ইঞ্জিন নৌকার ভটভট শব্দ। একদল দূরন্ত শিশু-কিশোর ছোটাছুটি করছে। নদীর বাঁধের ওপর একটি টিনশেড ঘর। এই ঘরটি ঘিরেই কিশোরদের যত ব্যস্ততা। কারণ টিনশেড ঘরটিই তাদের স্কুল। শিক্ষার্থীদের কেউ ব্লাকবোর্ড, কেউ টেবিল, কেউ ঘরের মেঝে পরিষ্কারে ব্যস্ত। মিস্ত্রিরা স্কুলটি  বসাতে দ্রুত কাজ করে যাচ্ছেন। কারণ যত দ্রুত কাজ শেষ হবে তত দ্রুত ভাঙনের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলটিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে। 

বলছিলাম ১৯৯১ সালে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের পূর্ব ছাতুনামা চর এলাকায় ৪৬ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব ছাতুনামা আমিনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি হয়। সে সময় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর পদচারণায় প্রতিষ্ঠানটি ছিল মুখরিত।

কিন্তু গত চার বছরে তিনবার নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে বিদ্যালয়টি। সর্বশেষ ২০২০ সালের বন্যায় বিদ্যালয়টির একমাত্র টিনের ঘরটি কোনো রকমে রক্ষা করা সম্ভব হলেও আসবাবপত্র বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন বাঁধে অস্থায়ীভাবে স্কুলের ঘরটি তোলা হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৫ জন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, ছাতুনামা চরে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস ছিল। ১৯৯১ সালে সেখানে বিদ্যলায়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৭ সালে প্রথম নদী ভাঙনের কবলে পড়লে বিদ্যালয়টিকে মধ্য চরে স্থানান্তর করা হয়। সর্বশেষে ২০২০ সালের নদী ভাঙনে স্থান পরিবর্তন করায় এখন স্কুলটি মূল জমি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বাঁধের ওপর স্থান পেয়েছে।

তিনি জানান, সরকারের নির্দেশনা মানতে বাঁধের ওপর ঘর তুলে স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম শুরু করব। শিশুদের মনোবল যাতে ভেঙে না যায় সেজন্য পুরোনো টিনগুলো দিয়ে তিন কক্ষের ঘর তৈরি করছি। কিছু আসবাবপত্র সংগ্রহ ও তৈরি করা হয়েছে।

প্রধান শিক্ষক জানান, বারবার ভাঙনের কবলে পড়ে স্কুলটির অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার অন্যত্রে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। তবে নতুন করে স্কুল স্থাপনের কারণে নতুন শিক্ষার্থীও ভর্তি হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন বাঁধে একটি টিনের দোচালা ঘর তিন ভাগ করে তিনটি শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দরজায় তালা লাগানোর কাজ করছেন একজন মিস্ত্রি। পাশেই নদীর পানিতে ব্লাকবোর্ড ধুয়ে নিয়ে আসছে দুইজন শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলে সব কিছু দেখভাল করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম আলী জানান, স্কুলের শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় স্কুলঘরটি রক্ষা পেয়েছে। ভাঙনের সময় সকলে নিজের ঘরবাড়ি বাঁচাতে মরিয়া ছিল। সে সময় অনুনয়-বিনয় করে নৌকার মালিকের কাছ থেকে নৌকা ও লোকজন নিয়ে শুধুমাত্র ঘরের টিন খুলে নিয়ে আসেন শিক্ষকরা। আসবাবপত্রগুলো চোখের সামনে নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

সহকারী শিক্ষক রকিবুল ইসলাম জানান, ২২ জোড়া বেঞ্চ, ৮টি চেয়ার, ৪টি টেবিল ও ২টি পুরাতন স্টিলের আলমারি ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। তবে অফিসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগেই সরানো হয়েছিল।

বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মতিয়ার রহমান বলে, আগে আমাদের স্কুল চরে ছিল। এখন বাঁধের ওপরে। এখন এখানেই ক্লাস করতে হবে। স্কুলে বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল না থাকলে প্রয়োজনে চটের ওপর ক্লাস করতেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। 

ডিমলা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম সাজ্জাদুজ্জামান জানান, চরের এ প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করতে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্কুলের মূল জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় পাকাকরণের অর্থ বারবার ফেরত যায়।

তিনি জানান, বর্তমানে স্কুলটির জমি নেই, স্থানীয় কোনো ব্যক্তি জমি দান করলে বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে যদি সরকারি খাস জমি পাওয়া যায় তবে স্থায়ীভাবে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা হবে।

আরএআর

Link copied