মাঠের ফসল থেকে বিদেশের বাজার : গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সূর্যোদয়

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার সবজি চাষি সাহাব উদ্দিন আগে মৌসুম শেষে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় বাজারদরের ওপর তাকে পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হতো। তবে, এক বছর আগে স্থানীয় একটি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সবজি উৎপাদনে যুক্ত হওয়ার পর চিত্রটি বদলে গেছে।
চুক্তি অনুযায়ী আগে থেকেই দাম নির্ধারণ হওয়ায় বাজারের ঝুঁকি কমেছে এবং এখন স্থানীয় সংগ্রহ কেন্দ্র থেকেই তার সবজি সংগ্রহ করা হয়। সাহাব উদ্দিন জানান, চুক্তির পর তার বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ফসল বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমায় এখন সংসার খরচ এবং সন্তানদের পড়াশোনা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে করতে পারছেন তিনি।
চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসারে কৃষকদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হচ্ছে। বাজারের দোদুল্যমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর না করে কৃষক এখন পূর্বনির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এতে ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের বার্ষিক আয় গড়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে
সাহাব উদ্দিনের মতো অনেক কৃষকই এখন গ্রাম বাংলায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন। বর্তমানে কৃষিপণ্য শুধু কাঁচামাল হিসেবে বাজারে যাচ্ছে না; বরং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তা গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন ভিত্তি তৈরি করছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণে কৃষকের আয় বাড়ছে, গ্রামে গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র শিল্প ও কর্মসংস্থান এবং কমছে শহরমুখী শ্রমের চাপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতই হতে পারে তৈরি পোশাকের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় শক্তিশালী রপ্তানি খাত।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থান
বর্তমানে মাঠের ধান, চাল, ডাল, ভুট্টা, ফল, সবজি ও মসলা প্রক্রিয়াজাত হয়ে ফলের জুস, ড্রাই ফুড, হিমায়িত সবজি, মুড়ি, আচার ও নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাদ্যে রূপ নিচ্ছে। এতে কৃষিপণ্যের ভ্যালু অ্যাডিশন বা মূল্য সংযোজন হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামে তৈরি হচ্ছে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিশেষ করে গ্রামীণ জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষকের আয় ও নিরাপত্তায়। আগে যেখানে মৌসুম শেষে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হতো, এখন চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, সংগ্রহ কেন্দ্র ও সরাসরি শিল্প-কারখানায় সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুধ, সবজি ও ফল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ফলে পরিকল্পিত উৎপাদন হচ্ছে, কৃষক নিশ্চিত বাজার পাচ্ছেন এবং পরিবারগুলোর মাসিক আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মাঠ থেকে উৎপাদিত ফসল শুধু কাঁচামাল হিসেবে নয়, বরং প্রক্রিয়াজাত হয়ে জুস, আচার বা হিমায়িত সবজি হিসেবে বাজারে আসছে। কাঁচা আমের চেয়ে আমসত্ত্ব তৈরিতে তিন গুণ বেশি লাভ হচ্ছে। এই ‘ভ্যালু অ্যাডিশন’ গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোকে শক্তিশালী করছে এবং পণ্যের অপচয় কমিয়ে মুনাফা বাড়াচ্ছে
নওগাঁর উম্মে হানিফা তার বাড়ির আঙিনা ও ছাদ ব্যবহার করে আমসত্ত্ব তৈরি এবং বিক্রি শুরু করেছেন। তিনি জানান, আগে কাঁচা আম বিক্রি করলে লাভ প্রায় শূন্যে ঠেকত। এখন আমসত্ত্বের মাধ্যমে একই পরিমাণ আম থেকে তিন গুণ বেশি আয় করছেন। ‘এখন প্রতি মাসে আমার আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। যা আগে কাঁচা আম বিক্রি করে সম্ভব ছিল না। এখন সংসারের খরচ, সন্তানদের স্কুল ফি ও ঋণ পরিশোধ করতে কোনো বেগ পেতে হচ্ছে না।’
প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত
শুধু কৃষকই নয়, প্রক্রিয়াজাত শিল্প গ্রামীণ বেকার যুবসমাজের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে। উৎপাদন শ্রমিক, প্যাকেজিং কর্মী, পরিবহন শ্রমিক ও মাননিয়ন্ত্রণ কর্মীর চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য কাজের সুযোগ আরও বেড়েছে। গ্রামের ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাত কারখানায় নারীরা প্যাকেজিং, মান যাচাই ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত হচ্ছেন। এতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একসময় শহরমুখী হওয়া যুবকদেরও নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান মিলছে।
রাজশাহী ও নওগাঁর বিভিন্ন গ্রামের বাড়িঘরের আঙিনা, ছাদ কিংবা উন্মুক্ত স্থানে রোদে ফেলে তৈরি হচ্ছে আমসত্ত্ব, আমের আচার ও নানা ধরনের চাটনি। পাশাপাশি যশোরে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেশীয় গুড়। শুধু রাজশাহী, নওগাঁ বা যশোর নয়; দেশের প্রতিটি জেলায় তৈরি হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য। সহজ পদ্ধতি, স্বল্প পুঁজি ও পারিবারিক শ্রমে স্থানীয় নারীরা এসব পণ্য তৈরি করছেন। দেশীয় স্বাদের এসব খাবারের চাহিদা এখন শহর ছাড়িয়ে বিদেশেও বেড়ে গেছে। ফলে বাড়ছে পারিবারিক আয়, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
গ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় স্থানীয় নারীদের কাজের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমসত্ত্ব, আচার তৈরি ও প্যাকেজিংয়ের কাজে নারীরা যুক্ত হওয়ায় তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বাড়ছে। এটি সামাজিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে এবং গ্রামীণ যুবকদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিচ্ছে
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আগে কৃষকরা মৌসুম শেষে পণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। এখন চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, সংগ্রহ কেন্দ্র ও সরাসরি শিল্প-কারখানায় সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
‘গ্রামে এখন কাঁচামাল উৎপাদনের বাইরে প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে নারীদের জন্য। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ায় শহরমুখী শ্রমের চাপ কিছুটা কমছে। অন্যদিকে, এসব পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনাও বেড়েছে। বিশেষ করে হিমায়িত খাদ্য, আচার, চাটনি ও গুড়সহ প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা বিদেশে দিন দিন বাড়ছে।’
তার মতে, ‘সঠিক নীতি, অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই খাতকে নার্সিং করতে পারলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।’
খাদ্যপণ্যের রপ্তানি ও সম্ভাবনা
বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে হিমায়িত খাদ্য, মসলা, শুকনা খাবার ও ফলভিত্তিক পণ্যের বড় চাহিদা রয়েছে। এই খাতের উদ্যোক্তা ও উৎপাদনকারীরা মনে করছেন, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা গেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য থেকে অল্প সময়ের মধ্যে বছরে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা সম্ভব। যা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে দেশের আরেকটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত হিসেবে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানায়, বাংলাদেশ প্রায় ৬৩ ধরনের মৌলিক কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ প্রায় ৭০০ ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১০০০ প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে রপ্তানিতে যুক্ত প্রায় ২৫০টি এবং বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ২০টি। এই খাতে প্রায় ৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিখাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে প্রায় ৮ শতাংশ অবদান রাখে এবং অন্যান্য শিল্প খাতের তুলনায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষমতা রাখে।
তৈরি পোশাক খাতের পর কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৪৮টি দেশে ৭০০ ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। মান নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি ও ব্র্যান্ডিং জোরদার করলে এই শিল্প তৈরি পোশাক খাতের পর শক্তিশালী রপ্তানি খাত হিসেবে দাঁড়াতে পারবে। ভেরিফাইড মার্কেট রিসার্চ অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য ছিল ১৪৩.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতি বছর প্রায় ৬.৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে ২০২৮ সালের মধ্যে ২৩৫.৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এই খাতের বাজার প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই খাত এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের মাইলফলক অতিক্রম করে। ওই বছরে রপ্তানি আয় ছিল ১২৮ কোটি ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৩ কোটি ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার আয় করে।
শিল্প ও কৃষির মেলবন্ধন
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজনের কোনো বিকল্প নেই, আর এই কাজটি সবচেয়ে কার্যকরভাবে করছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প।
তিনি বলেন, ‘প্রাণ গ্রুপ শুরু থেকেই কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে। এতে কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন এবং তাদের আয় টেকসই হচ্ছে। বর্তমানে প্রাণ গ্রুপের অধিকাংশ খাদ্যপণ্য দেশীয় কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা গ্রামে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এর ফলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছে।’
অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও আধুনিক কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস এবং নীতিগত জটিলতা এই খাতের বড় বাধা। ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হওয়া রোধে আধুনিক সংরক্ষণাগার জরুরি। এছাড়া, ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে
প্রাণ গ্রুপের পণ্য বর্তমানে ১৪৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বৈশ্বিক সম্ভাবনাকে তুলে ধরে— মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাকিলা সালাম মনে করেন, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘কাঁচা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে মূল্য সংযোজন বাড়ছে, ফলে কৃষকের আয় যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্রামে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। দুধ, ফল, সবজি ও শস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প কৃষি উৎপাদনকে আরও পরিকল্পিত ও বাজারমুখী করছে। ফলে কৃষক নিশ্চিত বাজার পাচ্ছেন এবং উৎপাদনের ঝুঁকি কমছে।’
তার মতে, এই খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এখন সঠিক নীতি সহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ
বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও অনেক চ্যালেঞ্জ এখনও রপ্তানি ও উৎপাদনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন গ্রহণের ঘাটতি উন্নত বাজারে প্রবেশ কঠিন করে তুলছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, কোল্ড চেইন সুবিধা, দক্ষ জনবল, ঋণপ্রাপ্তি ও কার্যকর লজিস্টিকস এবং উন্নত প্যাকেজিংয়ের অভাব পণ্যের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। রয়েছে পরিবহন সমস্যা, যা এই শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সরকারি লাইসেন্স প্রক্রিয়া, মান পরীক্ষা এবং বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন বিধিমালা উদ্যোক্তাদের জন্য সময় ও ব্যয় বাড়াচ্ছে। ঋণের সীমাবদ্ধতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদকদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এবং ফসলের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি— এসব চ্যালেঞ্জ এই খাতের বিকাশ ও রপ্তানি সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।
এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি খাদ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করতে প্রায় ৪২টি সংস্থার অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া ব্যবসা পরিচালনায় নবায়ন ফি, লাইসেন্স ফিসহ নানা ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়, যা প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মান এখন আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছালেও ট্যারিফ ব্যারিয়ার, শিপিং লাইন ও কনটেইনার ভাড়া বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউজ সুবিধার অভাব এবং বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের দুর্বলতা এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।’
ভবিষ্যৎ করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি বাড়াতে হলে ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস’ (GAP) অনুসরণ করা জরুরি। এছাড়া নতুন জাত উদ্ভাবন, লজিস্টিকস আধুনিকায়ন এবং বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাত থেকে বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা সম্ভব। কৃষিপণ্য বহুমুখীকরণ এবং ব্র্যান্ডিং জোরদার করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারবে।
এসআই/এসএম/এমএআর
