মৌলিক পড়ালেখা, গণিত ও ধারণাভিত্তিক দক্ষতায় পিছিয়ে শিক্ষার্থীরা

গত দুই দশকে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ভর্তি বৃদ্ধি, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের শেখার মান সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান ঘাটতি ও অসংগতি পর্যালোচনায় গঠিত একটি কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
এতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শ্রেণি উত্তীর্ণ ও সনদ পেলেও মৌলিক পড়ালেখা, গণিত ও ধারণাভিত্তিক দক্ষতায় তারা পিছিয়ে রয়েছে। সনদের সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। যা ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় খসড়া প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার অনন্ত নীলিম।
প্রতিবেদনের বলা হয়, গত দুই দশকে বাংলাদেশে বিদ্যালয় শিক্ষায় ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। আগের চেয়ে বেশি শিশু স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মিত হয়েছে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। দীর্ঘদিন এসব সূচককেই শিক্ষার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে যে শেখা অর্জন করার কথা, তা অর্জিত হয়নি। অনেক শিক্ষার্থী এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না, মৌলিক গণিত করতে পারে না, কিংবা ধারণা বোঝা, ব্যাখ্যা করা ও বাস্তবে প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। পরীক্ষায় পাস ও সনদ পাওয়া বাড়লেও প্রকৃত জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস বাড়েনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সনদের সংখ্যা বেড়েছে, শেখার মান বাড়েনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যতদিন এসব দৃশ্যমান সূচক বাড়ছিল, ততদিন দুর্বল শেখা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ তৈরি হয়নি। পরীক্ষার ফল এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, যাতে তা স্থিতিশীল দেখায়। এর ফলে বিদ্যালয়ে থাকা ও শেখার মধ্যকার ব্যবধান আর সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়নি, বরং ধীরে ধীরে এটি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পরিণতি এখন জরুরি হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধার সময়ের শেষ প্রান্তে রয়েছে। বর্তমানে যারা বিদ্যালয়ে পড়ছে, তারাই শিগগিরই শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বহু তরুণ সনদ নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে না। এর ফল হবে কম উৎপাদনশীলতা, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের সরকারি বিনিয়োগের দুর্বল প্রত্যাবর্তন।
প্রতিবেদনে এই সংকটের সামাজিক প্রভাবের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, শেখা নিশ্চিত না করেই শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ করার ফলে পরিবারগুলো ধরে নেয় যে সন্তানরা ঠিক পথে রয়েছে। ফলে দুর্বল শেখার ঝুঁকি রাষ্ট্রের বদলে পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনে বিনিয়োগ করে কিন্তু যাদের নেই, তারা পিছিয়ে পড়ে। এতে বৈষম্য বাড়ে এবং সরকারি শিক্ষার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয় হয়।
কমিটির মতে, শেখা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে গঠিত ও পরিচালিত হয়, তার মধ্যেই নিহিত। এখানে সাফল্য মাপা হয় এমন সূচকে, যেগুলো সহজে সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, তা পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। পাঠ্যক্রম সময়ের সঙ্গে ভারী ও অবাস্তব হয়ে উঠেছে, ফলে বিষয় বোঝার চেয়ে সিলেবাস শেষ করাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকরা পরীক্ষার চাপ ও প্রশাসনিক নির্দেশনার কারণে মুখস্থনির্ভর পাঠদানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।
এছাড়া মূল্যায়ন ব্যবস্থা এই সংকটকে আরও জোরদার করেছে। পরীক্ষার গুরুত্ব বেশি হলেও ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল। প্রত্যাশার সঙ্গে ফল না মিললে প্রশ্নপত্র, নম্বর বা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ফল সামঞ্জস্য করা হয়েছে। এতে দৃশ্যমান ব্যর্থতা কমেছে, কিন্তু পরীক্ষার প্রকৃত অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাসনব্যবস্থাতেও নিয়ম মানা ও প্রতিবেদন জমা দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; শেখার ব্যর্থতার মতো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তেমন উৎসাহ তৈরি হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনে কয়েকটি মৌলিক দিক পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে— শেখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবসম্মত করতে হবে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে পড়া, লেখা ও গণিতের ভিত্তি শক্ত করতে হবে, মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে; শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষের সময় সুরক্ষিত রেখে বাস্তব পাঠদানে সহায়ক তদারকি ও সহায়তা দিতে হবে এবং শাসনব্যবস্থায় শেখার ফলাফলের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে শেখার উন্নতির জন্য পাঁচটি নির্ণায়ক পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শেখার সঙ্গে বাস্তব পরিণতি যুক্ত করা, ব্যবস্থার সব বার্তা শেখার দিকে একমুখী করা, শেখার দায় পরিবার থেকে আবার ব্যবস্থার ওপর ফিরিয়ে আনা, শ্রেণিকক্ষে কাজে লাগে এমন তথ্য সময়মতো পৌঁছানো এবং অতিরিক্ত পাঠ্য বস্তু ও প্রশাসনিক বোঝা কমানো।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নিয়ম, রুটিন ও প্রত্যাশা নতুন করে নির্ধারণ করা সম্ভব। দেরি হলে দুর্বল শেখা শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে যাবে। প্রস্তাবিত ভিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যাশনাল লার্নিং ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্কের ওপর থাকবে।
তাই আগামী পাঁচ বছরে এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশ ‘বৃহৎ পরিসরে বিদ্যালয়’ থেকে ‘বৃহৎ পরিসরে শেখা’র দিকে অগ্রসর হতে পারবে বলেও কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী। সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— পলিসি রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং ক্যাম্পের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক সি. আর. আবরার।
আরএইচটি/এমএন