শিক্ষা ক্যাডারে বদলি-পদায়নে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছে মন্ত্রণালয়

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন তথ্য একই জায়গায় সংরক্ষিত রাখতে পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) নামে একটি ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু পিডিএসে বেশিরভাগ কর্মকর্তার সব তথ্য যুক্ত করা নেই। ফলে, এই ক্যাডারের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অল্পকিছু বদলি বা পদায়ন যা হচ্ছে তাও অনেকটা ‘অন্ধকারে ঢিল ছোড়া’র মতো প্রক্রিয়ায় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা ও অনলাইন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তথ্যঘাটতি, অসম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রোফাইল এবং ফাইলনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে পুরো বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া দিন দিন বিতর্কিত হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে পড়তে হচ্ছে বেকায়দায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের ‘এক প্রোফাইলেই সব তথ্য’— এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার স্বপ্ন বহুদিনের হলেও বাস্তবে অধিকাংশ কর্মকর্তার পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) এখনো তথ্যশূন্য ও অগোছালো। বর্তমান কর্মস্থলসহ কিছু মৌলিক তথ্য থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আগের কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না কিংবা আদৌ ওই ব্যক্তি জীবিত আছেন কি না, এমন অনেক মৌলিক তথ্য সেখানে নেই।

মূলত, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) কর্মজীবন শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই খোলা হয়। বিধি অনুযায়ী, এই পিডিএসে থাকার কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগ ও ক্যাডারভুক্তির তথ্য, কর্মস্থলের ধারাবাহিক ইতিহাস, পদোন্নতি, দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, পুরস্কার ও অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ পিডিএস বছরের পর বছর হালনাগাদ করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পিডিএস আপডেট করা থাকলেও দেখা যায় কোনো কর্মকর্তা তার শুধুমাত্র ইতিবাচক তথ্যগুলো যুক্ত করেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত কিংবা কোনো আপত্তি থাকলে সেগুলো আর উল্লেখ করছেন না।
অগোছালো পিডিএস ও অসম্পূর্ণ তথ্য
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বদলি বা পদায়নের সময় কোনো কর্মকর্তার পিডিএস তলব করলে প্রায়ই দেখা যায় তথ্য অসম্পূর্ণ, অসংলগ্ন কিংবা বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য থাকলেও কোথাও প্রশিক্ষণের ঘর ফাঁকা, আবার কোথাও পদোন্নতির তারিখ ও আদেশের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না। এমনকি কিছু পিডিএসে কর্মকর্তার বর্তমান পদ বা দায়িত্ব সম্পর্কিত তথ্য ভুলভাবে উল্লেখ রয়েছে। পিডিএস ব্যবস্থার এই দুর্বলতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিব্রতকর দিকটি হলো— মৃত শিক্ষকদেরও বদলি বা পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনা।
অতীতে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করার পরও তার পিডিএস হালনাগাদ না হওয়ায় স্বয়ংক্রিয় তালিকা প্রস্তুত বা ফাইল প্রক্রিয়াকরণের সময় তার নাম বদলি কিংবা পদোন্নতির তালিকায় চলে এসেছে। এসব ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সংশোধনী জারি করতে হয়েছে। তবে ততক্ষণে বিষয়টি প্রশাসনের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রকাশ্যে চলে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়কে পড়তে হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষক মৃত্যুবরণ করার পরও যদি তার নাম বদলি বা পদোন্নতির তালিকায় আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে সংশোধনী দিতে হয়, এতে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
তিনি আরও বলেন, নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যের অভাবে অনেক সময় বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করতে হয়। অনেক সময় তথ্য নিশ্চিত করতে একাধিক দপ্তরে চিঠি পাঠানো, ফোন করা বা নোট আদান–প্রদান করতে হয়। এতে করে প্রশাসনিক কাজে যেমন দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে হয়, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিলম্ব ঘটে।
কেন কার্যকর হচ্ছে না ‘এক প্রোফাইলে সব তথ্য’ ব্যবস্থা?
বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাগজে-কলমে শিক্ষা প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশনের নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে পিডিএস ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বহুল আলোচিত ‘এক প্রোফাইলেই সব তথ্য’ ধারণাটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে বদলি ও পদায়নের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এখনো নির্ভর করতে হচ্ছে অসম্পূর্ণ ও পুরোনো তথ্যের ওপর। অনলাইন সিস্টেম থাকলেও সেখানে তথ্য না থাকলে বা ভুল থাকলে শেষ পর্যন্ত কাগুজে নথিই ভরসা। এতে একদিকে যেমন সিদ্ধান্ত নিতে সময় বাড়ে, অন্যদিকে ভুল ও বিতর্কের সুযোগও তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— কেন শিক্ষকরা পিডিএস ফর্ম পূরণ বা নিয়মিত হালনাগাদ করতে আগ্রহী নন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরাসরি কথা বলতে কেউ রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এই অনীহার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অনেক শিক্ষকের ধারণা, পিডিএস হালনাগাদ করলেও বদলি বা পদায়নের ক্ষেত্রে এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। আবার কেউ কেউ এই তথ্য পূরণ করার প্রক্রিয়াটিকে বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ মনে করেন। এছাড়া, সব তথ্য এক জায়গায় থাকলে ভবিষ্যতে সেগুলো তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার হতে পারে— এমন একটি আশঙ্কাও কাজ করে অনেকের মধ্যে। মূলত এসব কারণেই পিডিএস ব্যবস্থাটি এখনও অনেকটা অকার্যকর হয়ে আছে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত প্রোফাইল ব্যবস্থা কার্যকর করার আহ্বান
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ড. মো. মাসুদ রানা খান এ বিষয়ে বলেন, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ‘এক ছাতার নিচে সব তথ্য’—এমন একটি সমন্বিত প্রোফাইল ব্যবস্থা খুবই দরকার ছিল। ‘পিডিএস’ তেমনই একটা ব্যবস্থা, কিন্তু এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে, বদলি ও পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, সরকারি কলেজের শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থাপনায় একসময় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও নীতিমালা কার্যকর ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নীতিমালার প্রয়োগে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বদলি নীতিমালার দোহাই দিয়ে কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হলেও সেগুলো বাস্তব প্রয়োজনে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে, বদলি ব্যবস্থার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ড. মাসুদ রানা খান বলেন, বর্তমানে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এতে শিক্ষকরা যেমন অনিশ্চয়তায় পড়ছেন, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক বদলি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ ডিজিটাল প্রোফাইল ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ যেমন সহজ হবে, তেমনি শিক্ষক সমাজও উপকৃত হবে।
‘জেমস অ্যাপে’র মতো আধুনিক ব্যবস্থা হতে পারে সমাধান
শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থাপনায় লেজেগোবরে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারের ‘জেমস অ্যাপ’ অনুকরণীয় হতে পারে। এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, কর্মস্থল, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সব তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকে। নির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো তথ্য পরিবর্তন করা যায় না বলে এর তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে। ফলে, বদলি বা পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রোফাইল সহজে যাচাই করা সম্ভব হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেমস অ্যাপ মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস-ভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবনের তথ্য ধাপে ধাপে সংরক্ষিত থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা সরাসরি এই ডেটাবেইস থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে বদলি বা পদায়নের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে ভুল তথ্য আসা বা মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরাও মনে করছেন, শিক্ষা ক্যাডারের মতো বৃহৎ একটি ক্যাডারে জেমস অ্যাপের মতো বা আরও আধুনিক কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করা হলে বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও নির্ভুল হবে। একই সঙ্গে পিডিএস হালনাগাদ করাকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করতে শক্তিশালী প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার কাছে গত ২ ফেব্রুয়ারি লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে, ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আরএইচটি/এমজে