জয় নিয়ে আশাবাদী রবিউল-জসীম, চাবি ভোটারের হাতে

ঢাকা-১০ আসনের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জোটের প্রার্থী ও সমর্থকরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি দিনভর বিভিন্ন এলাকায় মতবিনিময় সভা ও গণসংযোগ করছেন প্রার্থীরা। ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা গেছে।
ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও হাজারীবাগ থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে ধানের শীষে হয়ে লড়ছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম। অন্যদিকে, ১০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতা অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি ঈগল প্রতীক নিয়ে আছেন নির্বাচনী মাঠে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে নিয়ে এ আসনে নানা সমীকরণ ছিল। তবে তিনি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ায় সমীকরণ পাল্টে গেছে। এ আসনের ভোট এখন কার্যত বিএনপি ও ১০ দলীয় জোটের দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশলই নির্ধারণ করবে ভোটের চূড়ান্ত গতিপথ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগে করছেন। তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, ধানের শীষে ভোট চাইছেন। অন্যদিকে, ১০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী জসীম উদ্দীনও প্রচারণা শুরু করেছেন। এলাকায় বিশাল মিছিল ও পথসভার মাধ্যমে ভোটার টানার চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন
ভোটের প্রচারণা জোরদার হওয়ার সঙ্গে ভোটারদের আলোচনায় স্থান পাচ্ছে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি। বিশেষ করে মশার উপদ্রব, মাঠের স্বল্পতা, শিশুদের জন্য বিনোদনের অভাব এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট তীব্র যানজটের মতো সমস্যার কথা প্রার্থীদের কাছে তুলে ধরছেন তারা।
কলাবাগানের বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, ‘ভোট আসলে হবে কি না সেটা তো বুঝতেছি না। ভোট যদি সত্যি হয় দিমু। গত দুইটা-তিনটা নির্বাচনে তো মানুষ ভোট দিতে পারে নাই। প্রার্থীরা ভোট চাইতে বাসায় বাসায় আসে, বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের দেখা যায়। বাসায় বাসায় দলীয় লোকজন লিফলেট বিতরণ করে যায়।’

রাজধানীর পান্থপথের বাসিন্দা আবুল মৃদা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচনটা হওয়া দরকার। সবখানে অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বেশি খারাপ। বিএনপি আর জামায়াতের প্রার্থীরা ভোট চাইতে আসে। অন্য কাউকে তো দেখি না ভোট চাইতে আসে।’
নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান বলেন, ‘প্রার্থীরা আসে, ভোট চায়। কত কিছু করবে বলে আশ্বাস দিতেছে। কিন্তু এর আগেও তো আমরা দেখছি, ভোটের আগে সবাই কথা দেয়, নির্বাচিত হলে আর দেখা যায় না।’
বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। বিএনপি ও ধানের শীষের জয় হবে। আমি নির্বাচিত হলে রাজনীতির নামে কোনো অনৈতিক কার্যক্রম চলতে দেব না। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করব। বিএনপি সরকার গঠন করলে কি কি করবে সেটা আমাদের ইশতেহারে বলা হয়েছে। রাজনীতির নামে কেউ কোনো হয়রানি করে কি না আমাকে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। ব্যবসায়ীরা যেন ভয়ভীতি ছাড়া ব্যবসা করতে পারেন তা নিশ্চিত করব। কেউ রাজনীতির পরিচয় দিয়ে ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে নিয়ে এ আসনে নানা সমীকরণ ছিল। তবে তিনি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ায় সমীকরণ পাল্টে গেছে

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-১০ আসনের ভোটাররা বহুদিন ধরে চারটি বড় সমস্যায় জর্জরিত। মশার উপদ্রব এ অঞ্চলের প্রায় সারা বছরের স্থায়ী সমস্যা। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটালেও কার্যকারিতা নিয়ে বাসিন্দাদের হতাশা রয়েছে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মশার প্রকোপ থাকে বেশি, যা পরিবার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ভোগান্তি তৈরি করে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো খেলার মাঠের সংকট। এলাকাজুড়ে কয়েকটি মাঠ থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই বিভিন্ন ক্লাবের দখলে। স্থানীয় কিশোর-তরুণ কিংবা সাধারণ মানুষ মাঠে গিয়ে খেলতে পারেন না। এতে যেমন সুস্থ বিনোদনের সুযোগ কমে যাচ্ছে, তেমনি যুবসমাজের জন্য খেলাধুলা নিছক বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ধানমন্ডির ভোটার ও বাসিন্দা নুরজাহান বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখানে শিশুদের জন্য কোনো মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্র নেই। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো জায়গার অভাবও অনুভূত হয়। এতে পরিবারগুলো ছুটির দিনে বা অবসরে শিশুদের নিয়ে বাইরে যাওয়ার মতো বিকল্প পাচ্ছে না। ধানমন্ডি লেকটাই আমাদের শেষ ভরসা। সেটাকে আরও আধুনিকভাবে সাজানো যেতে পারে। মানুষ যেন চলাচল করতে পারে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, যানজট এখন এ আসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সড়কেই স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। ব্যস্ত সময়ে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও হাজারীবাগ এলাকায় প্রচন্ড যানজট লেগে থাকে। স্কুল, কলেজ, বাজার বা কর্মস্থলে যাতায়াত করা মানুষের জন্য এটাই নিত্যদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। সবমিলিয়ে মশার উৎপাত, মাঠ ও বিনোদন সংকট এবং তীব্র যানজট– এই চারটি সমস্যা এখনো ঢাকা-১০ আসনের মানুষের জীবনে বড় চাপ তৈরি করছে। ভোটারদের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তব উদ্যোগ নেবে।

ভালো সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী জসীম উদ্দীন বলেন, মানুষ পরিবর্তন চাইছে। আমি আশাবাদী, মানুষও আশাবাদী। আমি মানুষের প্রশংসা পাচ্ছি, দোয়া পাচ্ছি, সমর্থন পাচ্ছি, বিশেষ করে নারী উইংয়ের সমর্থনটা দুর্দান্ত। সবমিলিয়ে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা বলছেন, অনেক ভুগেছি কিন্তু আমাদের সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। মানুষ ভোগান্তি থেকে মুক্তি চায়, নেতৃত্বে পরিবর্তন চায়।
এবি পার্টির প্রার্থী নাসরীন সুলতানা মিলি বলেন, আমরা নির্বাচনী মাঠে আছি। আমাদের ইশতেহার ও কাজের মাধ্যমে তরুণদের আশা ও আকাঙ্ক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছি। নির্বাচনী মাঠকে যতটা মসৃণ করা করা দরকার সেটা আমরা এখনো দেখছি না, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। বড় দলগুলো বলছে, তারা জিতবে কিন্তু কেন তারা জিতবে? ভোটাররা কেন তাদের বাছাই করবে সেই কারণগুলো ব্যাখ্যা করছে না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ। ওই নির্বাচনে তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৮৯৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী শামসুল আলম, তিনি ভোট পেয়েছিলেন ২ হাজার ২৫৭ ভোট।
ফেরদৌস আহমেদ নির্বাচিত হওয়ার সাত মাসের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।
এমএসআই/এনআই/এসএসএইচ

