নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে তীব্র সমালোচনা আছে। ওই নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার সতর্ক অবস্থানে আছেন সারা দেশের জেলা প্রশাসকরা। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এবার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তারা। এজন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ডিসিরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটে জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতীতে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসকরা অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অতি উৎসাহী হয়ে একটা পক্ষ নিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে তারা কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন এবার বেশিরভাগ জেলা প্রশাসক নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করবেন।
বিতর্কিত অতীত : আওয়ামী লীগকে জেতাতে মরিয়া ছিল প্রশাসন
আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠে নানা অভিযোগ। ওই তিন নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনাও হয়। সাজানো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বার বার নির্বাচিত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তখনকার প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এসবের মূলে ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসকরা।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তদন্তে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কমিশন গত ১২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি নির্বাচনের সব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। এ উদ্দেশ্যে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ একটি সেলও গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি পায়।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ধীরে ধীরে প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এ সময় কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে যে নির্বাচন হয়, তা ছিল সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হিসেবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দল এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বিষয়টি অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। দলটিকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার হার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়।

সাবেক ডিসিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
বিগত তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আর ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়া বিতর্কিত ডিসিদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এর মধ্যে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি করা হয়। আর ২০ ফেব্রুয়ারি ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে ১২ জনকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এবার ‘সততা’র চ্যালেঞ্জ, সতর্ক ডিসিরা
আগের নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির সামনে থাকায় এবারের নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছেন বর্তমান ডিসিরা।
তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ এড়াতে সচেষ্ট রয়েছেন। দায়িত্ব পালনে সামান্য বিচ্যুতিও ভবিষ্যতে তাদের প্রশাসনিক জবাবদিহিতার মুখে ফেলতে পারে– এ বিষয় মাথায় রেখে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ তো অবশ্যই আছে। ফ্রি ও ফেয়ার ইলেকশন করার জন্য সরকার এবং ইলেকশন কমিশন বদ্ধপরিকর। সে অনুযায়ী আমরা ফিল্ড ঠিক রাখছি। ইলেকশন তো হলো একটা কম্বাইন্ড ইফেক্ট, টিম ওয়ার্ক। এখানে অনেকগুলো টিম কাজ করে। এখানে রিটার্নিং অফিসার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে ইলেকশন কমিশনের পক্ষ থেকে। কিন্তু অনেকগুলো ফ্যাক্টর এখানে কাজ করে।
‘আমাদের ওপর ন্যস্ত যতটুকু দায়িত্ব আইনের ভেতরে, সেটি আমরা ফিল্ডে শতভাগ বজায় রাখছি। পূর্ববর্তী ইলেকশনগুলোর সঙ্গে এবার কোনো মিল নেই বা সম্পর্ক নেই। আমরা এবার আপনাদের কমিটমেন্ট দিতে পারি, অন্তত খুলনায়, আমার যতটুকু এরিয়া, এখানে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ইলেকশন যাতে হয় সেটির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার টিমটাও ভালো মোটামুটি।’
এক্ষেত্রে কোনো আশঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশঙ্কা টুকটাক গোয়েন্দা রিপোর্ট বা পুলিশের প্রতিবেদনে থাকে। সেগুলো ধরে ধরে আমরা কাজ করব। সবখানে তো ঝুঁকিপূর্ণ না, দুই-চারটা কেন্দ্র হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ।
আ. স. ম. জামশেদ বলেন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুতি আছি। এ ধরনের ঘটনার আশঙ্কা করার আগেই আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে কাজ করছি। এ ছাড়া আপনারা জানেন, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছি। প্রত্যেকটা উপজেলায় দুইজন করে কাজ করছেন। সেখানে ইউএনও নিজেও একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসিল্যান্ড নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা কিন্তু ভিজিলেন্সে আছেন। তাছাড়া আমাদের নির্বাচন রিলেটেড বিচারিক কমিটি আছে। তারা আচরণবিধি দেখছেন এবং ল-অ্যান্ড-অর্ডার সিচুয়েশনটাও দেখছেন। সবকিছু আমাদের কন্ট্রোলে আছে। রাজনৈতিক দল যারা মুখোমুখি হয়ে যায়, সেখানে কিছু আশঙ্কা তো থাকেই। কিন্তু এটা একেবারেই কম। খুলনায় এ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি, ভবিষ্যতেও হবে না আশা করি।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার স্বাভাবিক দায়িত্বই হচ্ছে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা, সেটিই করে যাব আমি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই একটা চ্যালেঞ্জ। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ও সবকিছু মিলিয়ে সফলভাবে শেষ করা অবশ্যই বড় একটা চ্যালেঞ্জ। আমরা সবাই মিলে কাজ করছি সুশৃঙ্খলভাবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে, এটা আমাদের বিশ্বাস। সেভাবে কাজ করছি আমরা।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় জামায়াত ও বিএনপির সংঘর্ষে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম নিহতের ঘটনা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, যেটা ঘটে গেছে সেটা ঘটার কথা ছিল না। এ ধরনের ঘটনা আর যেন না হয় এজন্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলাপ করেছি, মতবিনিময় করেছি। একইসঙ্গে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ আমরা অ্যালার্ট আছি। ইতোমধ্যে এখানে বিজিবি মোতায়েন হয়েছে। আনসার-সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে সব জায়গায়। আমাদের নিজস্ব যে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, তারা কাজ করছেন। সবাই মিলে কাজ করছি। আশা করি আর কোনো ঘটনা ঘটবে না।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ঢাকা পোস্টকে বলেন, কক্সবাজার জেলায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। জেলার সার্বিক পরিস্থিতি বর্তমানে সন্তোষজনক রয়েছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, কক্সবাজারের নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত যথেষ্ট ভালো। আমরা একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।
দেশের অন্যান্য স্থানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজারের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে এই ডিসি জানান, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত সমন্বয় সভা হচ্ছে। সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘অসতর্কভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঞা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডিসিরা নির্বাচন কমিশনের অনুশাসনে কাজ করবেন। তাদের সবসময়ই সতর্ক থাকতে হয়। অসতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো নির্বাচনেই সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যে নির্দেশনা সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডিসিরা একা কাজ করেন না, অন্যদের সহায়তা নিয়ে তাদের কাজ করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাগুলো যাতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় সেদিকে তাদের খেয়াল রাখতে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই নির্বাচন ডিসিদের জন্য চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে তাদের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। না হলে তাদের প্রতি মানুষ আস্থা হারাবে।
এসএইচআর/এসএসএইচ