আলোচনা ছাড়াই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বৃদ্ধি ও দাম নির্ধারণ হয়েছে

ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে এবং একইসঙ্গে এসব ওষুধের দাম বেঁধে দিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএপিআই)। সমিতির নেতারা বলছেন, এই একতরফা সিদ্ধান্তে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ সরবরাহ ও শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন এ অভিযোগ করেন।
ডা. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাড়ানো এবং সেগুলোর দাম নির্ধারণ— দুটিই অত্যন্ত কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অথচ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসেনি। এমনকি শিল্পের সংগঠন হিসেবে বাপির সঙ্গেও কোনো পরামর্শ করা হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু দাম নির্ধারণ যদি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনা না করে করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বাপি মহাসচিব বলেন, গত আট থেকে নয় মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে সমিতির সঙ্গে কোনো কার্যকর যোগাযোগ নেই। উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী বা সচিব পর্যায়ের কেউই সমিতির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেননি। এমনকি ওষুধ শিল্পসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাইসিং কমিটি ও অবজার্ভার তালিকা থেকেও বাপিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়? দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত হয়েও আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না কেন? ডা. জাকির হোসেন আরও বলেন, ওষুধের দাম নির্ধারণের জন্য যে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে ওষুধ উৎপাদন বা ওষুধ ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন কাউকে রাখা হয়নি।
তার ভাষায়, যারা কখনো ওষুধ বানায়নি, যারা কখনো এই শিল্পের ভেতরে কাজ করেনি, তারা কীভাবে ওষুধের কারিগরি বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে? বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যেমন একজন সাংবাদিকই মিডিয়ার ভেতরের সমস্যা সবচেয়ে ভালো বোঝেন, তেমনি ওষুধ শিল্পের জটিল কারিগরি দিক বাইরের লোক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
ডব্লিউএইচওর গাইডলাইনের কথা উল্লেখ করে শিল্প প্রতিনিধিদের ডাকা হচ্ছে না— এই যুক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি। ডা. জাকির বলেন, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা বলে যাদের ওপর বাস্তবায়নের দায়িত্ব, তাদের মতামতই যদি না নেওয়া হয়, তাহলে নীতিমালা বাস্তবসম্মত হয় না। পরে তারা স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিতভাবে তাদের যুক্তি ও প্রস্তাব জমা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ওষুধ শিল্পের স্বচ্ছতা ও নজরদারি প্রসঙ্গে ডা. জাকির হোসেন বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নারকোটিক্সসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ১৪ বার রিপোর্ট দিতে হয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ইটিপি মনিটরিংয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যার সংযোগ সরাসরি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত এবং তা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। তার ভাষায়, ভুল তথ্য দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সেটা চাইও না।
মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, ওষুধ কারখানায় কাজ করা অফিসার পর্যায়ের সবাই গ্র্যাজুয়েট বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এমনকি ফিল্ড লেভেলের কর্মীদেরও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়। ফ্যাক্টরির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (এইচভিএসি সিস্টেম) কাজ করতে হয়, কর্মীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, জুতা ও নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ বাধ্যতামূলক।
ডা. জাকির হোসেন আরও বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প একটি কৌশলগত খাত। এই খাতকে বাদ দিয়ে, অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে নীতিনির্ধারণ করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ওষুধের সরবরাহ ও গুণগত মানের ওপর।
শেষাংশে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলাদা সেশন আয়োজন করে শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তার মতে, শিল্প ও রোগী—দু’পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণের কোনো বিকল্প নেই।
টিআই/জেডএস