বিজ্ঞাপন

হামের লক্ষণ থাকা রোগী বাড়ছে চট্টগ্রামে, বেশিরভাগের নিউমোনিয়া

অ+
অ-
হামের লক্ষণ থাকা রোগী বাড়ছে চট্টগ্রামে, বেশিরভাগের নিউমোনিয়া

চট্টগ্রাম বিভাগে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বিভাগটির কক্সবাজার, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। 

বিজ্ঞাপন

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে জানা গেছে, এ বছরের শুরু থেকে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে ইতোমধ্যে ৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে বর্তমানে কক্সবাজারে ২৮ জন, চাঁদপুরে ১২ জন, কুমিল্লায় ১৮ জন এবং চট্টগ্রামে দুজন রোগী আক্রান্ত হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আরও বেশ ক’জন। 

সংক্রামক এই রোগের উপসর্গ নিয়ে নীরবে প্রায়ই বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। হাসপাতালভিত্তিক খোঁজ নিয়ে শুধুমাত্র গত ১০ দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে৷ বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২৫ শিশুর ভর্তি, ছয়জনের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না নেওয়া এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। পোস্ট-মিজেলস নিউমোনিয়ার রোগী এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হাম হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জটিলতায় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে। এসব রোগীকে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই বছর বিশ্বজুড়ে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ফলে একটি বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যার কারণে অনেক শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। 

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি ঢাকা পোস্টকে বলেন, হামের উপসর্গ থাকা রোগীর অন্যান্য জটিলতায়ও মৃত্যু হতে পারে। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ল্যাব টেস্টে কনফার্ম হওয়া চাঁদপুরের দুই শিশু ঢাকায় মারা গেছে। তবে হামের বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। কারণ অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগ একজন থেকে ১৮ জন পর্যন্ত ছড়াতে পারে। 

আজ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনসাধারণকে এই রোগের বিষয়ে সচেতন হতে হবে, টিকা দিতে হবে। আমাদের আপাতত টিকার কোনো সংকট নেই। 

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের জটিলতা নিয়ে শিশু ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে বর্তমানে ১২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর আগে ১৩ জন ভর্তি হলেও ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত পুরনো কর্নারটিকে এখন হাম কর্নার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভর্তি হওয়া শিশুদের অধিকাংশই কক্সবাজার অঞ্চল থেকে এসেছে এবং প্রায় সবাই ১৫ মাসের নিচে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো— দুই শিশুর বয়স ছয় মাসেরও কম, অর্থাৎ তারা এখনো টিকার আওতায় আসেনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুছা মিঞা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে রোগী আসছে। এখন পর্যন্ত ১৩ জন ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চট্টগ্রামের বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতালে পরিস্থিতি আরও শঙ্কাজনক। গত ১০ দিনে সেখানে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে আইসিইউতে ছয়জন ভর্তি রয়েছে, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন শিশু ভর্তি হয়। যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে দুইজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দুইজন এবং বোয়ালখালী ও হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন করে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, হাটহাজারী ও বোয়ালখালীতে ইতোমধ্যে দুজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা এলাকার আশপাশে ১২০টি বাড়ি পর্যন্ত অনুসন্ধান করে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

এর আগে রোববার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এমআর/এনএফ