যে পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘকাল ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে আজ এক সন্ধিক্ষণমূলক ও নিয়তিনির্ধারক দিন বলা যায়। শনিবার সকালে যখন স্পষ্ট হয়ে যায়, প্রথম দফার হামলাতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, তখন থেকে তার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে নানা ধরনের খবর ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, খামেনির কম্পাউন্ড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছিল, তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এরপর খবর আসে, ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দেবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। সন্ধ্যা নামার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, অনেক লক্ষণই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আর জীবিত নেই।
পরিচয় গোপন রেখে একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইসরায়েলি ও মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত একের পর এক প্রতিবেদনে বলা হতে থাকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে।
আর পুরোটা সময়জুড়ে ইরানি কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন।
• প্রস্তুতি ছিল ইরানের
কিন্তু তারপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবর জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর, ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করে।
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের উত্তাল ইতিহাসে এমন খবর অত্যন্ত নিয়তিনির্ধারক মুহূর্ত। তবে দেশটির ক্ষমতাবান ধর্মীয় নেতা ও সামরিক কমান্ডাররা এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসছিলেন।
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে সে প্রস্তুতি আরও বেগবান হয়। প্রথম রাতে প্রথম দফার হামলাতে ইসরায়েল ইরানের ৯ জন পরমাণু বিজ্ঞানী এবং একাধিক নিরাপত্তা প্রধানকে হত্যা করে।
পরবর্তী কয়েক দিনে আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং অন্তত ৩০ জন শীর্ষ স্থানীয় সামরিক কমান্ডার ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। সেসময় এটাও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আয়াতুল্লাহও তাদের লক্ষ্যবস্তুর আওতায় থাকতে পারেন।
ওই সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সেই যুদ্ধের সময়ে বিশেষ বাঙ্কারে অবস্থান করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করছিলেন, যারা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমতার শীর্ষ স্তরে সম্ভাব্য শূন্যতা ঠেকাতে পারবেন।
এমনকি খামেনি গত বছরের সংঘর্ষের আগেই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে গঠিত অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসকে সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সেসময় বলেছিল, খামেনিকে যদি হত্যা করা হয় সে পরিস্থিতির জন্য তিনি নিজে তিনজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বেছে রেখেছিলেন।
কে তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন তা নিয়ে বহু বছর ধরেই জল্পনা চলছিল, যার মধ্যে তার ছেলে মোজতবা খামেনির নাম উল্লেখযোগ্য।
প্রথম দিনের বিমান হামলা ও টার্গেটেড হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও যারা এখনও দায়িত্বে আছেন বা এ পরিস্থিতিতে বড় পদে উঠে এসেছেন, তারা সবাই এখন দেখাতে চাইবেন, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখনও তাদের হাতে আছে এবং নেতৃত্ব পরিবর্তন নির্বিঘ্নভাবে হবে।
তবে আয়াতুল্লাহর ৩৬ বছরের শাসনের অবসান তার সমর্থকদের জন্য, বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ সহকারী ও মিত্রদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। খামেনির ঘনিষ্ঠ সহকারী ও মিত্রদের বড় একটি অংশ হলো অভিজাত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কােরের (আইআরজিসি) সদস্য, যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে রক্ষা করা, সেটা দেশে ও দেশের বাইরে; সবখানে।
তবে বিবিসির যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরান ও কারাজের রাস্তায় কিছু মানুষ খামেনির মৃত্যুর খবরে উল্লাস প্রকাশ করছেন। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর সন্দেহ এবং ইসরায়েলের প্রতি বৈরী মনোভাব নিয়ে খামেনি কঠোরভাবে শাসন করেছেন।
তিনি সংস্কারের আহ্বান এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভগুলো কঠোরভাবে দমন করেছেন। খামেনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর সম্মুখীন হন গত কয়েক বছরে। কারণ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত হয় এবং সেই সাথে দেশের জনগণের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের দাবির মুখে পড়ে খামেনির শাসনামল।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানকে একেবারেই ভিন্ন এক দেশ বলে মনে হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়নে হাজার হাজার ইরানি নিহতের ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্ট ক্ষত ও ক্ষোভ ছিল একবার টাটকা।
কিন্তু শনিবার যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সাথে শুরু হওয়া নতুন দ্বন্দ্বে ঘটনার মােড় ঘুরে গেছে। খামেনির আকস্মিক বিদায়ের পর সবার দৃষ্টি এখন তার উত্তরসূরির দিকে। এছাড়া, ক্ষমতার শীর্ষে এ পরিবর্তনের ফলে ৪৭ বছরের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পরিচালনায় কোনও পরিবর্তন হবে কিনা, সেটিও এখন প্রশ্নের বিষয়।
তবে যিনিই সামনে আসুন না কেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য একই থাকবে আর তা হলো এমন এক ব্যবস্থার টিকে থাকা নিশ্চিত করা, যেখানে ধর্মীয় নেতা ও তাদের শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী ক্ষমতার কেন্দ্রেই থাকে। তবে যে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, তা ইতোমধ্যেই অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে এগোতে শুরু করেছে।
এসএস