ইরানের হুঁশিয়ারি: হরমুজ দিয়ে এক লিটার তেলও যাবে না, ব্যারেল হবে ২০০ ডলার

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এবার এক নতুন এবং বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হতে যাচ্ছে— যার নাম ‘তেল’। পারস্য উপসাগরের অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে এক লিটার তেলও যেতে না দেওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরানের সাফ কথা— ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়ানোর জন্য যেন বিশ্ববাসী এখন থেকেই প্রস্তুত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের জেরে এই জলপথটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি? আর কেনই বা ইরান এই চরম সিদ্ধান্ত নিল? আল-জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটি ঢাকা পোস্টের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
বুধবার আইআরজিসির খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো জাহাজকে এখন থেকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এক বিবৃতিতে ওই মুখপাত্র বলেন, ‘আপনারা কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমিয়ে রাখতে পারবেন না। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, আর তোমরাই (যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা) এই অঞ্চলের অস্থিরতার মূল উৎস।’
অস্থির তেলের বাজার ও যুদ্ধ পরিস্থিতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কোনো কূল-কিনারা না মেলায় তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনবরত হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল আক্রমণের ফলে তেলের দাম পাগলা ঘোড়ার মতো উঠানামা করছে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবারও ওমান উপকূলের কাছে একটি থাই পতাকাবাহী কার্গো জাহাজসহ মোট তিনটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার জাহাজগুলোকে এই প্রণালী দিয়ে চলাচল চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি তাদের যাওয়া উচিত। খুব দ্রুতই সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।’
মানবিক সংকটের সতর্কতা
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অচলাবস্থার কারণে সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি এই জলপথ দিয়ে ত্রাণবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এক চরম বিপৎসংকুল সময় পার করছি।’
জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ের সিদ্ধান্ত
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নানা পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান বুয়েগার বলেন, ‘যদি দ্রুত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া না হয়, তবে ইউরোপ এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে।’
বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ৩২টি সদস্য রাষ্ট্রের জরুরি মজুত থেকে একযোগে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, ‘এটি বাজার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ। তবে মনে রাখতে হবে, হরমুজ প্রণালী চালু না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না।’
এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং জাপান তাদের জাতীয় মজুত থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, তাদের দেশের তেলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। আগামী সোমবার থেকেই তারা এই সংরক্ষিত মজুত ছাড়তে শুরু করবে।
সূত্র : আল-জাজিরা
এমএআর/