মাগরিবের নামাজের সময় নিভে গেল ৪০৮ প্রাণ

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার আফগান তালেবান সরকারের একজন মুখপাত্র পাকিস্তানের হামলায় হতাহতের এই পরিসংখ্যান জানিয়েছেন। এই হামলা ঘিরে দুই প্রতিবেশী দেশের চলমান দ্বন্দ্বে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে হামলার দাবিকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, সোমবার রাতে কাবুলে সামরিক স্থাপনা এবং সন্ত্রাসী সহায়তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে নির্ভুলভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, ‘‘হামলার পর দৃশ্যমান দ্বিতীয় দফার বিস্ফোরণগুলো পরিষ্কারভাবে বড় আকারের গোলাবারুদের মজুতের উপস্থিতি নির্দেশ করে।’’
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই মুসলিম দেশের মাঝে চলা উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। উভয় পক্ষকে যুদ্ধের বিস্তার রোধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানানোর কয়েক ঘণ্টা পরই কাবুলে ওই বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
বিজ্ঞাপন

গত মাসে শুরু হওয়া এই সংঘাত ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগাভাগি করা দুই প্রতিবেশীর মাঝে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চীনের মতো বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর মধ্যস্থতায় লড়াই কিছুটা স্তিমিত হলেও পবিত্র রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের মাত্র কয়েক দিন আগে তা আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে পুরো অঞ্চলে যখন অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার বৈরী দুই প্রতিবেশী দেশের মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
• এটি ছিল কেয়ামতের মতো : বেঁচে ফেরা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা
বিজ্ঞাপন
ঘটনাস্থলে একতলা একটি পোড়া ভবন আগুনের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যান্য জায়গায় ভবনগুলো কাঠ ও ধাতব স্তূপে পরিণত হয়েছে। কেবল হাসপাতালের কয়েকটি শয্যা অক্ষত অবস্থায় দেখা গেছে। কম্বল ও রোগীদের ব্যবহারের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল মতিন কানি বলেন, পাকিস্তানের হামলায় ৪০৮ জন নিহত এবং ২৬৫ জন আহত হয়েছেন। আফগান কর্তৃপক্ষ বলেছে, হতাহতদের উদ্ধারের পর কাবুলের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে কতজনের মরদেহ উদ্ধার এবং কীভাবে এই সংখ্যা গণনা করা হয়েছে; সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, হাসপাতালটি এমন এক জায়গায় অবস্থিত যেখানে আগে একটি সামরিক ঘাঁটি ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হাসপাতালে মানুষ যখন মাগরিবের নামাজ শেষ করছিলেন, ঠিক তখনই তিনটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এর মধ্যে দু’টি বোমা সরাসরি রোগীদের ওয়ার্ডে আঘাত হানে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ৫০ বছর বয়সী আহমদ বলেন, ‘‘পুরো জায়গায় আগুন ধরে গিয়েছিল। এটি ছিল কেয়ামতের মতো। আমার বন্ধুরা আগুনের মধ্যে পুড়ছিল, আমরা সবাইকে বাঁচাতে পারিনি।’’
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ফুটেজে দেখা যায়, আগুনের লেলিহান শিখা একতলা ভবনটি গ্রাস করছে এবং উদ্ধারকর্মীরা স্ট্রেচারে করে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছেন। কাবুলের অ্যাম্বুলেন্স চালক হাজি ফাহিম রয়টার্সকে বলেন, ‘‘গতরাতে আমি এখানে পৌঁছে দেখি সবকিছু পুড়ছে, মানুষ পুড়ছে। ভোরের দিকে তারা আবার আমাকে ডেকেছে। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মরদেহ রয়েছে।’’
• লাগাতার মিথ্যাচার, বলছে পাকিস্তান
তালেবানের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বলেন, সোমবার রাত ৯টার দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘ওমিদ হাসপাতালে ওই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, এটি ছিল দুই হাজার শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘‘হাসপাতালের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিহতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৪০০ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ২৫০ জন।’’

নিহতদের বেশিরভাগই নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি বলে জানিয়েছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।
তবে পাকিস্তানের হামলায় আফগানিস্তানে হতাহতের এই সংখ্যা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সংঘাত চলাকালীন উভয়পক্ষই পরস্পরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও কোনও নিরপেক্ষ সূত্র থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাদকাসক্তদের নিশানা করার দাবিকে ‘‘অনবরত মিথ্যাচার’’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসী এবং তাদের অবকাঠামো নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের এই ‘‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’’ চলবে।
• শান্ত থাকার আহ্বান চীনের, ভারতের নিন্দা
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কাবুলের ওমিদ হাসপাতালে কয়েকশ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সেলাই ও কাঠমিস্ত্রির মতো কাজের প্রশিক্ষণও দিয়ে আসছিল।
পাকিস্তান-আফগানিস্তানের এই সংঘাতে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার এবং ওই অঞ্চলে অবস্থানরত চীনা নাগরিক ও প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, উত্তেজনা হ্রাস এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে বেইজিং।

কাবুলে হাসপাতালে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বর্তমান তালেবান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘পবিত্র রমজান মাসে যখন সারা বিশ্বের মুসলিমরা শান্তি ও ক্ষমার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেন, সেই সময়ে এই হামলা চালানো হয়েছে; যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।’’
এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র দুই প্রতিবেশীর মধ্যে গত মাসে সংঘাত শুরু হয়। ওই সময় পাকিস্তান দাবি করে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা হিসেবে অভিহিত করে পাকিস্তানে পাল্টা হামলা শুরু করে আফগানিস্তান।
ইসলামাবাদ অভিযোগ করে বলেছে, কাবুলের বিভিন্ন আস্তানা থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে জঙ্গিরা। তবে তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, উগ্রবাদ দমন করা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
সূত্র: রয়টার্স।
এসএস