বিজ্ঞাপন

‘অন্তহীন যুদ্ধ’ এড়াতেই কি পিছু হটলেন ট্রাম্প?

অ+
অ-
‘অন্তহীন যুদ্ধ’ এড়াতেই কি পিছু হটলেন ট্রাম্প?

মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার হুমকি থেকে সরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিপর্যস্ত এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতারা একটি ‘কার্যকর’ পরিকল্পনা পেশ করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে তিনি ১৪ দিনের এক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন; যা প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধের অবসানে পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারীরা সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এর মাঝেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে, বদলে যায় ট্রাম্পের সুর। চুক্তির তৎপরতার বিষয়ে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন দুই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘‘এমনকি ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনও পর্দার আড়াল থেকে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে সক্রিয় ছিল।’’

অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘‘যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার কারণ হলো আমরা ইতোমধ্যে আমাদের সমস্ত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সাফল্য পেয়েছি। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে আমরা একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছি।’’

dhakapost

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানকে বেধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে যুদ্ধবিরতির ওই ঘোষণা দেন ট্রাম্প। সময়সীমার মাঝে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।

বুধবার হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ট্রাম্প। এই যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি তাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আল্টিমেটামের সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলীয় আইনপ্রণেতারা পুরো ইরানি সভ্যতাকে মুছে ফেলার বিষয়ে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকিকে ‘‘নৈতিক ব্যর্থতা’’ হিসেবে অভিহিত করে এর নিন্দা জানান। অন্যদিকে পোপ চতুর্দশ লিও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকিকে ‘সত্যিই অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

তবে শেষ পর্যন্ত একটি সহজ সত্যের কারণেই পিছু হটেছেন ট্রাম্প। সেটি হলো সংঘাত বৃদ্ধি পেলে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে হতো; যা মার্কিন এই প্রেসিডেন্টের পূর্বসূরিদের জন্য অতীতে চরম সঙ্কট তৈরি করেছিল। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে এই ধরনের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন।

dhakapost

• আদৌ কী হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারতেন ট্রাম্প?

গত ছয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যের বিষয়ে ট্রাম্প যেভাবে বড়াই করেছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল তিনি ইরানকে বোমা মেরে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবেন। পুরো যুদ্ধের সময়ে তিনি এমন ধারণা থেকেই বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত এই সম্ভাবনাকে আমলেই নেননি যে, ইরানের ক্ষমতাসীন নেতারা এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ বেছে নিতে পারেন।

গত ৪৭ বছরে ইরান বারবার দেখিয়েছে, তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকতে প্রস্তুত। এমনকি যখন আমেরিকার কাছে মনে হয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই কাজ করছে তখনও।

দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব ১৯৭৯ সালের শেষ দিক থেকে ১৯৮১ সালের শুরু পর্যন্ত ৪৪৪ দিন মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার মাধ্যমে এর মাশুল গুণতে হয়েছিল। ইরানের শাসকরা বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসাত্মক ইরান-ইরাক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সূত্রপাত করা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল ইরান। এই যুদ্ধের ফলে গাজায় ইরান-সমর্থিত হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি খর্ব হয়। এ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের যুদ্ধ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা সিরিয়ায় তেহরান-সমর্থিত বাশার আল-আসাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটায়।

বিপর্যস্ত ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরানের নেতারা এই আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন, শক্তিশালী মার্কিন বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও বিশ্বের এই পরাশক্তিকে একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আটকে ফেলতে সক্ষম তারা।

মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। তবে এই জলপথের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও বিপুল সম্পদনির্ভর অভিযানের প্রয়োজন হতো; যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বহু বছরের প্রতিশ্রুতির বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারতো।

অলাভজনক সংস্থা ব্যাটল রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বেন কোনেবল বলেন, প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং যাতায়াতকারী জাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করার জন্য পশ্চিমের কিশ দ্বীপ থেকে পূর্বের বন্দর আব্বাস পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কিলোমিটার (৩৭৩ মাইল) ইরানি ভূখণ্ডের ওপর মার্কিন বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হতো।

তিনি বলেন, এই অভিযানের জন্য তিনটি মার্কিন পদাতিক ডিভিশন বা প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ হাজার সৈন্যের প্রয়োজন হতো।

‘‘এটি একটি অনির্দিষ্টকালের অভিযান হতে পারতো। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ২০ বছর ধরে এটি করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’’

মার্কিন মেরিন কর্পস ইন্টেলিজেন্সের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা ভাবিনি, আমাদের ২০ বছর আফগানিস্তানে থাকতে হবে। আমরা ভিয়েতনাম বা ইরাকেও এত দীর্ঘ সময় থাকতে হবে বলে চিন্তাও করিনি।

আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা বলেন, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় ইরান ও ওমান উভয় দেশকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি আদায়ের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান এই অর্থ দেশের পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করবে। তবে ওমান এই অর্থ কী কাজে ব্যবহার করবে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ওমান এবং ইরান; উভয় দেশের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। বিশ্ব এতদিন এই পথটিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল এবং আগে কখনও এর জন্য কোনও টোল দেওয়া হয়নি।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট দলীয় সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ট্রাম্প কার্যত তেহরানকে এই প্রণালির ‘‘নিয়ন্ত্রণ’’ দিয়ে দিচ্ছেন এবং এটি ইরানের জন্য এক ‘‘ইতিহাস পরিবর্তনকারী বিজয়’’ নিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, ‘‘অযোগ্যতার এই মাত্রা একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং হৃদয়বিদারক।’’

• সর্বোচ্চ দাবি জানিয়ে অতীতেও পিছু হটার নজির আছে ট্রাম্পের

এই সঙ্কটের সমাধানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কূটনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ট্রাম্পের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানোর পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। একই সঙ্গে ইরানকেও দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি।

বড় ধরনের কোনও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের জন্য ‘দুই সপ্তাহ’ সময়কালটি ট্রাম্পের বেশ পছন্দের। গত বছরের গ্রীষ্মে হোয়াইট হাউস বলেছিল, ইরানের ওপর প্রাথমিক বোমা হামলা চালানোর বিষয়ে তিনি দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বিমান হামলার নির্দেশ দেন এবং হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন।

রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার সময়ও ট্রাম্প বার বার দুই সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলেন; যা শেষ পর্যন্ত তেমন কোনও সফলতা বয়ে আনতে পারেনি। এমনকি তার প্রথম মেয়াদের কথা ধরলে দেখা যায়, তিনি স্বাস্থ্যসেবার মতো বড় নীতিনির্ধারণী সমস্যাগুলোও এই সময়ের মধ্যে সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৫ মাসে ট্রাম্প বার বার সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব দাবি পূরণ হওয়ার আগেই পিছু হটেন তিনি।

গত বছরের এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের কারণে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। সম্ভবত এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গিয়েছিল দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গত জানুয়ারি মাসের বৈঠকে। সেখানে গ্রিনল্যান্ডের ‘‘অধিকার, স্বত্ব ও মালিকানাসহ’’ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে জেদ ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে তার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং নিজের দাবি আদায়ে ইউরোপের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে সরে আসেন।

সে সময় পিছু হটার অজুহাত হিসেবে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ন্যাটোর প্রধানের সঙ্গে একটি ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামোর’ বিষয়ে একমত হয়েছেন। যদিও ডেনমার্কের ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ব্যাপক সামরিক সুবিধা ভোগ করে আসছিল।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সহযোগীরা যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি তৈরির জন্য মার্কিন বাহিনীর বীরত্ব এবং ট্রাম্পের কৌশলী পদক্ষেপকে কৃতিত্ব দেন।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘‘আমাদের সামরিক বাহিনীর সাফল্য দর-কষাকষির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলকে কঠিন আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে একটি কূটনৈতিক সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি হয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সক্ষমতাকে কখনই ছোট করে দেখবেন না।’’

সূত্র: এপি, রয়টার্স, বিবিসি।

এসএস