‘পুরুষের পাশে নারীদের কাজ করা উচিত নয়’

Dhaka Post Desk

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৩৮ পিএম


‘পুরুষের পাশে নারীদের কাজ করা উচিত নয়’

আফগানিস্তানের কট্টর ইসলামপন্থী নতুন শাসকগোষ্ঠী তালেবানের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ‘পুরুষের পাশে আফগান নারীদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া উচিত হবে না’ বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ব্রিটিশ বাতাংসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তালেবান সরকারের এই পরিকল্পনার ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছেন তিনি।

রয়টার্স বলছে, ‘এই সিদ্ধান্ত যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে আফগানিস্তানের সরকার, অফিস, ব্যাংক, গণমাধ্যম কোম্পানি এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও নারীদের কাজে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।’

তালেবান নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ এবং কট্টর এই গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ নেতা ওয়াহিদুল্লাহ হাশিমি বলেছেন, তালেবান আফগানিস্তানে পুরোপুরি শরিয়া আইন বা ইসলামি আইনের বাস্তবায়ন করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নারীদের চাওয়া অনুযায়ী কাজের অনুমতি দেওয়ার চাপ প্রয়োগ সত্ত্বেও আফগান নতুন শাসকগোষ্ঠী তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

তড়িৎ গতির অভিযানের মাধ্যমে গত মাসে সারা দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তালেবানের নেতারা বলেছেন, ‘শরিয়া আইনের সীমার মধ্যে থেকে আফগান নারীরা কাজ এবং পড়াশোনার অনুমতি পাবেন।’ তাদের এই আশ্বাস সত্ত্বেও শরিয়া আইনের প্রয়োগে নারীরা আদৌ চাকরি ক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারবেন কি-না তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তালেবান যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছিল, তখন চাকরি এবং শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত ছিলেন নারীরা।

এই সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আফগানিস্তানে দেওয়া আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে দেশটিতে ব্যাপক মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক আফগান নাগরিক তাদের পুরোনো আসবাদপত্র, এমনকি লেপ-তোষক, থালাবাটিও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

হাশিমি বলেছেন, ‘আফগানিস্তানে শরিয়া আইনি ব্যবস্থা আনার জন্য আমরা প্রায় ৪০ বছর ধরে লড়াই করেছি। শরিয়া... পুরুষ এবং নারীকে পরিবারের বাইরে এক ছাদের নিচে একত্রিত হওয়ার অথবা একসঙ্গে বসার অনুমতি দেয় না।’

‘পুরুষ এবং নারীরা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন না। এটা পরিষ্কার। তারা আমাদের অফিসে আসার এবং মন্ত্রণালয়ে কাজ করার অনুমতি পাবেন না।’

তালেবানের নতুন সরকারের নীতিতে হাশিমির এই মন্তব্যের কতটা প্রতিফলন থাকবে সেটি পরিষ্কার নয়। তবে অন্যান্য কিছু কর্মকর্তার জনসম্মুখে করা মন্তব্য তার তুলনায় বেশি বলে লিখেছে রয়টার্স।

তালেবানের কাবুল জয়ের পর এই গোষ্ঠীর মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছিলেন, আমাদের সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন নারীরা। তারা বিভিন্ন খাতে কাজ করবেন। তিনি আফগানিস্তানের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে ফেরার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাতে নারীদের কথাও বলেছিলেন। 

মন্ত্রিসভায় শুধুই পুরুষ

কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর দেশটিতে যে মন্ত্রিসভার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাতে একজন নারীও ঠাঁই পাননি। এমনকি কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যাপক অভিযোগও আসছে।

হাশিমি বলেছেন, নারীদের কাজে নিষেধাজ্ঞা অবশ্য গণমাধ্যম এবং ব্যাংকিং খাতের ওপরও প্রযোজ্য হবে। ২০০১ সালে তালেবানের পতন এবং পশ্চিমা-বিশ্ব সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দুই খাতে আফগান নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেছেন, বাড়ির বাইরে পুরুষ এবং নারীদের যোগাযোগের অনুমতি নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে দেওয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে নারীরা পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন বলে জানান তিনি।

নারীদের শিক্ষা এবং মেডিক্যাল খাতে কাজ এবং পড়াশোনা করার অনুমতি দেওয়া উচিত; তবে সেখানে তাদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নারীদের আমাদের প্রয়োজন; যেমন— স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে। আমরা তাদের জন্য পৃথক ইনস্টিটিউশন করবো। আলাদা হাসপাতাল, আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়, আলাদা স্কুল, আলাদা মাদরাসাও হতে পারে।

এর আগে, রোববার তালেবানের নতুন শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন। তবে শ্রেণিকক্ষে অবশ্যই পুরুষদের থেকে তাদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করতে হবে।’

গত দুই দশকে নারীরা যেসব অধিকার অর্জন করেছেন, তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে সেগুলো রক্ষার দাবিতে আফগানিস্তানজুড়ে কয়েকটি বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন নারীরা। তালেবানের সশস্ত্র যোদ্ধারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে নারীদের কিছু বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে।

গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অন্যতম বড় সফলতা হিসেবে আফগানিস্তানের অধিক রক্ষণশীল প্রত্যন্ত এলাকার তুলনায় নগরগুলোতে নারীদের অধিকারের উন্নতি ঘটেছে বলে দাবি করা হয়; যার অবসান ঘটে গত ৩১ আগস্ট দেশটি থেকে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর চলে যাওয়ার মাধ্যমে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত বছর আফগানিস্তানে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ২৩ শতাংশ। তালেবান যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে দেশ শাসন করেছিল সেই সময় এই হার ছিল একেবারে শূন্য।

সূত্র: রয়টার্স।

এসএস

Link copied