১০ জনকে হত্যাচেষ্টা : হাসিনাসহ ১১৩ জনের নামে মামলার তদন্তে ভিন্ন চিত্র

সীমান্ত স্কয়ার থেকে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে জুলাই আন্দোলনের সময় ৪ আগস্ট ধানমন্ডি-২৭ এর মীনা বাজারের সামনে আহত হন সাহেদ আলী। সে সময় ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ ৯ জন আহত হন। এ ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে আসামি করে সাহেদের কথিত ভাই শরীফ বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ মামলার তদন্তকালে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মামলার তদন্ত করে আহতদের খুঁজে পাননি মামলার তদন্তকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক শাহজাহান ভূঞাঁ। তথ্যগত ভুল উল্লেখ করে শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে সম্প্রতি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক আবুল বাশার।
উল্লেখযোগ্য অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, মোহাম্মদ এ আরাফাত, জুনায়েদ আহমেদ পলক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মাহবুবুল আলম হানিফ, শামীম ওসমান, ফেরদৌস আহমেদ, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঞাঁ বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতদের নিয়ে গেজেট হয়েছে। এ মামলায় যে সমস্ত আহতদের কথা বলা হয়েছে, গেজেটে তাদের নাম পাইনি। তথ্যগত ভুলের কারণে আপাতত আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে প্রতিবেদন দিয়েছি। যদি পরবর্তীতে আহতদের তথ্য পাওয়া যায়, পরে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে।
মামলার বাদী শরীফ বলেন, ওই ঘটনার সময় আমিও সেখানে ছিলাম। আমাকে মারধর করা হয়। অনেকে আহত হয়। জুলাই-অগাস্টের মামলায় পুলিশ সত্যতা পায়নি, বিষয়টা কেমন যেন। আহতরা বিভিন্ন ফার্মেসি, বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়েছে। আর ওই সময় তো চিকিৎসা নেওয়াটা কেমন ছিল আমরা সবাই জানি। তিনি বলেন, আমি তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। মামলাটা নিয়ে থ্রেটও এসেছে। আসামিরা থ্রেট দিয়েছে। বিচার চাওয়াটা কি অপরাধ?
এদিকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার তদন্ত কর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক শাহজাহান ভূঞাঁ মামলার বাদী শরীফের ভাই সাহেদ আলীসহ অন্যান্য আহতদের সন্ধান করার জন্য সীমান্ত স্কয়ার মার্কেট, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ এবং ঘটনাস্থলের আশেপাশের হাসপাতালে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করেন। বাদীকে নোটিশ দিয়ে অনুরোধ করেন তার ভাইকে থানায় হাজির করতে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আসামিরা আওয়ামী লীগ ও তার দলীয় অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ দলীয় নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, কমিশনার, আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডার, অর্থদাতা ও সমর্থক। মামলা সংক্রান্তে তথ্য প্রদানের জন্য হাজারীবাগ বাদীর ভাড়া বাসায় নোটিশ পাঠান। তবে বাড়িওয়ালা জানান, শরীফ নামের কাউকে চেনেন না এবং সেখানে থাকে না। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে বের করেন, বাদীর নাম শরিফুল ইসলাম। লক্ষ্মীপুর সদরের ১৪ নং মান্দারী এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। সেখানে খবর নিলে কেউ তাকে চিনেন না। তার মোবাইল বন্ধ থাকে। তবে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কখনো খোলা থাকে, আবার কখনো বন্ধ থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বেশ কয়েকদিন অপেক্ষার পর শরীফ ধানমন্ডি লেকের পাশে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ভিকটিমকে হাজির করতে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানান। তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও তিনি ভিকটিমকে হাজির বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহ করেননি। চিকিৎসা প্রদান সংক্রান্ত কোনো তথ্য এজাহারেও উল্লেখ করেননি বাদী।
গত ২৩ জানুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শরীফকে পরদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত, জখমি ও সাক্ষীদের উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্ত তারা কেউই উপস্থিত হননি। পরে তদন্ত কর্মকর্তা আহত সাহেদ আলীকে বিভিন্নভাবে খুঁজেও পাননি।
মামলার বাদী শরীফ এজাহারে উল্লেখ করেন, ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীও আহত হয়। তবে পর্যাপ্ত তথ্য, পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা, ক্লাশ রোল না থাকায় কলেজে খুঁজেও তাদের তথ্য পাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কর্মকর্তা আশপাশের হাসপাতালেও খবর নেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, শরীফের উল্লিখিত নামের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি বা চিকিৎসা নেননি।
এজাহারে উল্লেখিত আহত সাহেদ আলী, রাশেদ, জুয়েল, মাহমুদ, নাহিদ, রাসেল, মিরাজ, জান্নাতুল ফেরদৌস নাঈমা, আইশ আক্তার, সাম্মি আক্তারের সন্ধান পাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য, কোনো হাসপাতালে বা ক্লিনিকে বা অন্য কোনো স্থানে চিকিৎসা নিয়েছে কি না তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আহতদের কোনো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
এ মামলায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- শাকিল হোসেন ইমরান, কামরুল হাসান ওরফে কামু, মারুফ হোসেন এবং মাসুদ রানা বেপারী।
কামরুল হাসান ওরফে কামুর আইনজীবী পীযূষ কান্তি বলেন, আমার আসামি হয়রানির শিকার হলো। আদালতকে আমরা বিষয়টা বলেছি, বুঝানোর চেষ্টা করেছি। আদালতও পরিস্থিতির শিকার।
এনআর/এমএন