বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে মায়ের জবানবন্দি

‘ভাত রেডি করো’ বলে বের হওয়া সজল ফিরল লাশ হয়ে

অ+
অ-
‘ভাত রেডি করো’ বলে বের হওয়া সজল ফিরল লাশ হয়ে

‘ভাত রেডি করো, আমি এখনই এসে দুই ভাই একসঙ্গে খাবো’—এই বলে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন ১৭ বছরের সজল। কিন্তু সেই ‘এখনই’ আর ফিরে আসেনি কখনও। ১৩ দিন পর গাজীপুরের একটি হাসপাতালের মর্গে মিলেছিল তার নিথর দেহ। আজও সেই দিনের অপেক্ষা আর বুকভাঙা শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন মা ভুলু বেগম।

বিজ্ঞাপন

সেসব হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন ৫২ বছর বয়সী এই নারী। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল আজ (২ এপ্রিল)। দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে ভুলু বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল।

বাসাবাড়িতে কাজ করতেন ভুলু বেগম। ছোটবেলা থেকেই থাকেন ঢাকায়। তার দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম আজাদ। ছোট ছেলে সজলের বয়স ছিল ১৭ বছর। যিনি গুম হয়ে লাশ হয়ে ফিরেছিলেন ২০১১ সালে।

ভুলু বেগম বলেন, ২০১১ সালের জুলাইয়ে ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় দুই ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতাম। আজাদ ছিল বাসের সহকারী। আর ইট-বালুর দোকানে কাজ করতো সজল। একই মাসের ৪ তারিখ দুপুরে বাসায় এসে ভাত খেতে চায় ছেলেটি। কিছুক্ষণ পর আজাদও আসে। খাটে বসে টিভি দেখতে থাকে তারা দুই ভাই। তখন ভাত হলেও তরকারি হয়নি। এর মধ্যেই সজলের মোবাইলে একটি কল এলে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যায়। ওই সময় তাকে ভাত খেয়ে যেতে বলে আজাদ।

বিজ্ঞাপন

‘আজাদ আমাকে বলে তোমার ছেলে ভাত না খেয়ে চলে যাচ্ছে। আমি সজলকে জানালা দিয়ে ডেকে বলি ভাত খেয়ে যা। সজল বলে আমি একটু কথা বলে আসি। খাবার রেডি করো, আমি এখনই এসে দুই ভাই একসঙ্গে খাবো। এরপর আমার সজল আর ফিরে আসেনি।’

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওই দিন আসরের নামাজ পর্যন্ত ভাত নিয়ে সজলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ছেলেটি ফিরে না আসায় আমি ও আজাদ মিলে খুঁজতে বের হই। হাসপাতাল ও স্থানীয় থানাসহ বিভিন্ন জায়গায় তাকে ৮-৯ দিন ধরে খুঁজতে থাকি। কিন্তু তাকে খুঁজে পাইনি। থানা-প্রশাসন আমাকে কোনো সহযোগিতা করেনি।

একদিন গাজীপুর এলাকার একটি হাসপাতালে দুটি মরদেহ পড়ে আছে বলে খবর পান ভুলু বেগম। দিনটি ছিল ২০১১ সালের ১৩ জুলাই। একই খবর পান আজাদ।

বিজ্ঞাপন

সজলের মা বলেন, সজল আছে কিনা খবর জানতে আজাদকে গাজীপুরে পাঠানো হয়। নিজের এক বন্ধুকে নিয়ে গাজীপুর হাসপাতালে যায় আজাদ। ওই হাসপাতালেই মেলে সজলের মরদেহ। এরপর ফোনে বিষয়টি নিজের খালুকে জানায় আমার বড় ছেলে। একইসঙ্গে আত্মীয়স্বজন নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে সজলের মরদেহ বুঝে নিয়ে ১৪ জুলাই জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ভুলু বেগম বলেন, আমার ছেলে সজল বিএনপির রাজনীতি করতো। মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতো। সাদেক হোসেন খোকা সাহেব আমার ছেলেকে পছন্দ করতো। আমি পরবর্তী সময়ে জানতে পেরেছি যে রাজনীতি করার কারণে র‍্যাবের বড় অফিসার আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গাজীপুরে হত্যা করেছে। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একইসঙ্গে ছেলে হত্যার বিচার চেয়েছেন।

জবানবন্দি শেষে ভুলু বেগমকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

এমআরআর/এসএম