সশস্ত্র গ্রুপ, বিকল সিসিটিভি : নির্বাচনে রোহিঙ্গা ক্যাম্প বড় ঝুঁকি!

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং রোহিঙ্গাদের যেকোনো ধরনের নির্বাচনী তৎপরতা থেকে দূরে রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ সতর্কতা দিয়েছে একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থাটির এক গোপন প্রতিবেদনে নির্বাচনকালীন নাশকতা, ভুয়া ভোট প্রদান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের ব্যবহারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে। একইসঙ্গে, ঝুঁকি মোকাবিলায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ ও অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সময়ে স্বার্থান্বেষী কোনো মহল এসব গ্রুপকে ব্যবহার করে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গ্রুপ ও অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি থাকায় নির্বাচনকালীন নাশকতার আশঙ্কা করছে একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। তারা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল, জনসভা বা প্রচারণায় অংশ নিতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে
গোপনীয় ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অনেক রোহিঙ্গা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এসব অবৈধ ভোটার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা রাজনৈতিক মিছিল, জনসভা বা গণসংযোগের মতো নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে, নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কঠোর ও মানবিক ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ক্যাম্পে আগে থেকেই সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধচক্রের সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে এসব গ্রুপকে ব্যবহারের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কোনোভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে।
কী আছে গোয়েন্দা সংস্থার চিঠিতে
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ‘সিল’ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ক্যাম্পের বিশাল আয়তন, কার্যকর সীমানা প্রাচীরের অভাব এবং অধিকাংশ সিসিক্যামেরা অকেজো থাকায় নির্বাচনকালীন সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পুরোপুরি ‘সিল’ করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে ওই গোয়েন্দা সংস্থা।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে গত ৬ ও ৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একাধিক উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনেক বাসিন্দা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তারা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলে সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিল, জনসভা ও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন— এমন সুনির্দিষ্ট ঝুঁকির কথাও আলোচনায় আসে।
গোপনীয় ওই চিঠিতে সুপারিশ করা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি যেন রোহিঙ্গাদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সব দলকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হলে তা নির্বাচনী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে— এই মর্মে রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে সতর্ক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটগ্রহণের আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান নির্বাচন পর্যন্ত এবং ভোট-পরবর্তী অন্তত এক সপ্তাহ অত্যন্ত কঠোরভাবে চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অনেক রোহিঙ্গা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন; তারা যেন ভোট দিতে না পারেন সেজন্য ভোটগ্রহণের সাত দিন আগে থেকেই কক্সবাজার ও ক্যাম্প এলাকায় আটক কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে
এ ছাড়া, অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় নাম ওঠানো রোহিঙ্গাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে ভোটগ্রহণের সাত দিন আগে থেকেই কক্সবাজার শহর ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের এলাকায় তাদের আটক কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। চিঠিতে ক্যাম্পে দায়িত্বরত সিআইসিদের (ক্যাম্প ইনচার্জ) নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্পের বাইরে অন্য কোনো দায়িত্বে না পাঠানোর এবং নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে সার্বক্ষণিকভাবে (২৪ ঘণ্টা) ক্যাম্পে অবস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এপিবিএনের তিনটি ব্যাটালিয়নের (৮, ১৪ ও ১৬) কোনো সদস্যকে নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্পের বাইরে দায়িত্ব না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমে ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে অধিকসংখ্যক টহল বাড়ানো, চেকপোস্ট স্থাপন এবং নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকেই ক্যাম্প সংলগ্ন ভোটকেন্দ্রগামী সড়কগুলোতে কড়া নজরদারি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প সিল করা ‘অবাস্তব’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকালীন সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ‘সিল’ করতে না পারা মূলত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে ফুটিয়ে তোলে। যেসব ক্যাম্পে বছরের পর বছর ধরে কার্যকর সীমানা প্রাচীর, পর্যাপ্ত নজরদারি ক্যামেরা ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথের অভাব রয়েছে, সেগুলো হঠাৎ করে নির্বাচনের সময় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বা ‘সিল’ করা যাবে—এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত ঘাটতি ও অবহেলার প্রতিফলন।
তবে, এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ওই গোয়েন্দা সংস্থা বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনকালীন সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করা, ক্যাম্পের সীমানা প্রাচীর ও অকেজো সিসিক্যামেরা মেরামতে জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং দ্রুততম সময়ে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা তৎপরতা জটিল হলেও তা অত্যন্ত অনিবার্য। ক্যাম্পে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নির্বাচনের স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। যেকোনো স্বার্থান্বেষী মহল সহজে এসব গ্রুপকে ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পের বিশাল আয়তন, কার্যকর সীমানা প্রাচীরের অভাব এবং অধিকাংশ সিসিক্যামেরা অকেজো থাকায় এই এলাকা পুরোপুরি ‘সিল’ করা অসম্ভব। এটি মূলত আমাদের দীর্ঘদিনের নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিকেই ফুটিয়ে তুলছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প শুধু ভোটের নয়, জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, “আমি বলব, রোহিঙ্গা ক্যাম্প শুধু ভোটের নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পে বহু বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অবৈধ অস্ত্রের মজুত রয়েছে। নির্বাচনের সময় এই গ্রুপগুলোকে যেকোনো স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই ব্যবহার করতে পারে— যা কেবল রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বরং পুরো কক্সবাজার ও সীমান্তবর্তী এলাকার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।”
তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পের আকার বিশাল, সীমানা প্রাচীর কার্যকর নয় এবং অধিকাংশ সিসিক্যামেরা অকেজো। এমন অবস্থায় শিথিল বা আংশিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা মানেই নির্বাচনী ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। আমার পরামর্শ হলো, নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে ক্যাম্পের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। এখানে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না; এটি শুধু নির্বাচন নয়, দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রশ্ন। স্পষ্টভাবে বলতে চাই— নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল থাকলে নির্বাচনকালীন সময়ে ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বা নাশকতা ঘটতে পারে।”
নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ক্যাম্প সিল করার কথা বললেও গোয়েন্দা সংস্থার মতে, সীমানা প্রাচীরের অভাব এবং সিসিক্যামেরা অকেজো থাকায় এটি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়
এর আগে গত ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পুরোপুরি ‘সিল’ (আবদ্ধ) করে রাখা হবে, যাতে কেউ সেখান থেকে বের হতে বা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ও সীমান্ত অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের ধারণা, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক কিছু কর্মকাণ্ড নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ যদি সীমান্ত পেরিয়ে একটি অস্ত্র ক্যাম্পে নিয়ে আসে, তবে তা খুঁজে বের করা কঠিন। তাই নির্বাচনের নিরাপত্তা রক্ষায় রোহিঙ্গাদের চলাচলে অবশ্যই কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।”
এমএম/এমজে
