গোপন তথ্য প্রচার-জুয়ার বিজ্ঞাপনে জেল, লাইসেন্স ছাড়া চলবে না টিভি-ওটিটি

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন তথ্য প্রচার এবং অনুমোদনহীন বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে জেল-জরিমানার বিধান রেখে ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই আইনে জননিরাপত্তা রক্ষায় সামরিক-বেসামরিক গোপন তথ্য ফাঁস এবং জুয়া বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে কড়া শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) চিঠি দিয়ে খসড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত চাওয়া হয়েছে। ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েই এই অধ্যাদেশ জারি করা হবে। খসড়া অধ্যাদেশের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী— এই অধ্যাদেশ জারির পর সরকার বিধান অনুযায়ী সম্প্রচার কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করবে।

সম্প্রচার কমিশন গঠনের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি গঠন করবে সরকার। এই কমিটি কমিশনার হিসেবে নিয়োগের জন্য যোগ্য ও বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। পাঁচ সদস্যের এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
সম্প্রচার কার্যক্রম তদারকি ও ব্যবস্থাপনার জন্য ৫ সদস্যের একটি স্বতন্ত্র ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠন করা হবে। টিভি-রেডিওর পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট, আইপি টিভি এবং বাণিজ্যিক পোর্টালকেও লাইসেন্স নিতে হবে
কমিটিতে সদস্য হিসেবে আরও থাকবেন—
* সম্প্রচার কার্যক্রমে ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুইজন বিশেষজ্ঞ।
* তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব।
* তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব (যিনি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন)।
চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে এই বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুইজন করে প্রার্থীর নাম সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। পাশাপাশি, বাছাই কমিটি তাদের নিজস্ব সভার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের এখতিয়ার পাবে। বাছাই কমিটির প্রস্তাবিত তালিকা থেকে সরকার সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেবে। পাঁচ সদস্যের এই কমিশনে অন্তত একজন নারী কমিশনার রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
লাইসেন্স বাতিল-জরিমানার ক্ষমতা পাবে সম্প্রচার কমিশন
খসড়া অধ্যাদেশের ৯ ধারা অনুযায়ী, সম্প্রচার কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হবে দেশের সরকারি ও বেসরকারি সম্প্রচার কার্যক্রমকে একটি সুসংগঠিত এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা। একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল প্রবাহ নিশ্চিত করতে কমিশন প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়ন করবে। শুধু নীতিমালা তৈরিই নয়, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্বও পালন করবে এই কমিশন।
লাইসেন্স প্রদান ও নীতিমালা প্রণয়ন : সম্প্রচার কমিশন শুধুমাত্র তদারকিই নয়, বরং নতুন কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়েও সরকারকে সুপারিশ করবে। সম্প্রচার কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনমুখী করতে প্রয়োজনীয় প্রবিধান, কোড অব কন্ডাক্ট (আচরণবিধি), এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া, এই অধ্যাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি বিস্তারিত ‘সম্প্রচার নির্দেশিকা’ তৈরি করবে এই শক্তিশালী কমিশন।

কমিশনের ক্ষমতা ও শাস্তি : প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, কমিশন নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত বিষয়বস্তু তদারকি করবে। যদি কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের কন্টেন্ট নির্ধারিত নীতিমালা বা নির্দেশিকার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে কমিশন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারবে। এই নির্দেশনা অমান্য করলে কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিমানা আরোপ, সংশোধিত প্রচারের নির্দেশ কিংবা চূড়ান্তভাবে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিটিআরসির সঙ্গে সমন্বয় : কারিগরি জটিলতা নিরসনে কমিশন সরাসরি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর সঙ্গে সমন্বয় করবে। পারস্পরিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে দুই কমিশনের মধ্যে প্রতি মাসে অন্তত একটি নিয়মিত সভা আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যাতে কারিগরি বা নীতিগত যেকোনো বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়।
বিরোধ মীমাংসা ও পরিদর্শন ক্ষমতা : সম্প্রচারিত বিষয়বস্তু নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির আইনি প্ল্যাটফর্ম হবে এই কমিশন। শুধু তাই নয়, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের মধ্যকার বিরোধ অথবা কন্টেন্ট সরবরাহকারীদের সাথে সৃষ্ট আইনি জটিলতা মীমাংসার দায়িত্বও পালন করবে কমিশন। প্রয়োজনে কমিশন যেকোনো সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় সশরীরে পরিদর্শন করতে পারবে এবং তদন্তের স্বার্থে ডিজিটাল প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের পূর্ণ ক্ষমতা পাবে।
সম্প্রচার সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হবে, যেখানে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সম্প্রচারকদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘আচরণবিধি’ থাকবে; নির্দেশ অমান্য করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতা থাকবে কমিশনের হাতে
রেটিং ব্যবস্থা ও রাজস্ব তদারকি : আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং দেশীয় প্রচলিত আইন অনুসরণ করে প্রতিটি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সার্বজনীন রেটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করবে কমিশন। এছাড়া, সম্প্রচার খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সরকারকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে এই সংস্থা।
জবাবদিহিতা ও বার্ষিক প্রতিবেদন : কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতিবছর ১ মার্চের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারের কাছে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর সরকার তা উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপনের ব্যবস্থা নেবে।
আপিল ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত : কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনায় কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান সংক্ষুব্ধ হলে, বিধি অনুযায়ী সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে। তবে এই আপিলের বিপরীতে সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা : বিশেষ প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে কোনো জরুরি তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে কমিশন সম্প্রচারকারীদের সরাসরি নির্দেশনা দিতে পারবে। এই নির্দেশনা পালন করা সব সম্প্রচারকারীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত মতামত চাপানো যাবে না সম্প্রচারে
খসড়া অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী— সব সম্প্রচারকারীকে কমিশনের প্রণীত নির্দেশিকা, কোড অব কন্ডাক্ট এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ করতে হবে। শৈল্পিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা মানার কথা বলা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, সম্প্রচার কার্যক্রমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণআন্দোলন ও অভ্যুত্থানের সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে। একইসঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে প্রচারমাধ্যমগুলোকে কার্যকর অবদান রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ এবং যাচাইকৃত তথ্য প্রচারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোনো বিশেষ মতাদর্শ প্রচার বা ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং তথ্যের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সব ধরনের বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, খবর প্রচারের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুনদের জন্য আবেদন ও ফি বাধ্যতামূলক
অধ্যাদেশের ১৩ ধারা অনুযায়ী, এই আইন কার্যকর হওয়ার পর সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। লাইসেন্স ছাড়া টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন ও রেডিও, স্যাটেলাইট টিভি ও রেডিও, ক্যাবল টেলিভিশন, আইপি টিভি ও আইপি রেডিও, ডিরেক্ট-টু-হোম (ডিটিএইচ), এফএম এবং কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ইনফোটেইনমেন্ট ও এন্টারটেইনমেন্টভিত্তিক ওটিটি টিভি সার্ভিস, স্ট্রিমিং ও ভিডিও-অন-ডিমান্ড প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি পেশাদার ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনলাইন ইনফোটেইনমেন্ট পোর্টাল, অ্যাপস এবং ভিডিও স্ট্রিমিং কার্যক্রমকেও লাইসেন্সের আওতায় আনা হচ্ছে।
সংবাদ বা সম্প্রচারে কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না; বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কারিগরি ও তরঙ্গ সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে প্রতি মাসে বিটিআরসি ও সম্প্রচার কমিশন সমন্বয় সভা করবে
অধ্যাদেশ জারির আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত যেসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের এই আইনের অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হিসেবেই গণ্য করা হবে। তবে নতুন করে লাইসেন্স পেতে ইচ্ছুক সম্প্রচারকারীদের নির্ধারিত বিধি বা প্রবিধান অনুযায়ী ফি পরিশোধ করে আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর কমিশন তা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
তরঙ্গ বরাদ্দ ও অনাপত্তি: যেসব ক্ষেত্রে তরঙ্গ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে, সেসব ক্ষেত্রে লাইসেন্সের আবেদন করার আগেই বিটিআরসি থেকে পর্যাপ্ত তরঙ্গ প্রাপ্যতা সাপেক্ষে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। যেকোনো নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ আইনত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আপিল ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: লাইসেন্স সংক্রান্ত কমিশনের কোনো সিদ্ধান্তে কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান সংক্ষুব্ধ হলে, নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে। তবে এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

শর্ত ভাঙলে বাতিল হবে সম্প্রচার লাইসেন্স
খসড়া অধ্যাদেশের ১৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো লাইসেন্সধারী সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্তাবলি ভঙ্গ করলে কমিশন কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে কমিশন লাইসেন্স স্থগিত করতে পারবে। এ ছাড়া, লাইসেন্স বাতিল করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, লাইসেন্স গ্রহণের সময় ধারা ১৩-তে উল্লিখিত অযোগ্যতার তথ্য গোপন করা হলে, লাইসেন্সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সম্প্রচার শুরু করতে ব্যর্থ হলে কিংবা সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া সরাসরি বা পরোক্ষভাবে লাইসেন্স বা নিবন্ধনের মালিকানা হস্তান্তর করা হলে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে। এছাড়া কমিশনের নির্দেশিত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া বাস্তবায়ন না করা; সম্প্রচার নির্দেশিকার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কনটেন্ট প্রচার; অশ্লীল, মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রচার; রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, নাশকতা ও সহিংসতা সৃষ্টিকারী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, জনশৃঙ্খলা বা আইনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী এবং জনস্বার্থ বা দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি বিষয়বস্তু সম্প্রচার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড, অনুমোদন, অনাপত্তিপত্র বা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কমিশন সর্বোচ্চ ১৪ দিনের জন্য কোনো লাইসেন্স বা নিবন্ধন স্থগিত করতে পারবে। এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারকারী সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে কমিশন ওই লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে।
সম্প্রচার আইন লঙ্ঘনে সংশ্লিষ্ট সবাই পাবেন দণ্ড
অধ্যাদেশের খসড়ার ২১ ধারায় অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সম্প্রচারকারী এই আইনের ধারা ১৩(১) ও ১৩(৯) লঙ্ঘন করে কোনো সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করলে এ প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। কোনো সম্প্রচারকারী জাতীয় ইস্যুতে ও জনস্বার্থে সরকারের দেওয়া নির্দেশনা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি সম্প্রচার যন্ত্রপাতি অনাপত্তি ছাড়া আমদানি করে কোনো ধরনের সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করে, এ আমদানি ও সম্প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোপন তথ্য ফাঁস : কোনো সম্প্রচারকারী যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো গোপনীয় সামরিক ও বেসামরিক তথ্য-উপাত্ত প্রচার করেন, তবে সংশ্লিষ্ট প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নিষিদ্ধ ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন : কোনো সম্প্রচারকারী যদি সরকারের অনুমোদনহীন বা লাইসেন্সবিহীন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, বাজি, জুয়াখেলা, তামাক ও তামাকজাত পণ্য, অ্যালকোহল বা মদজাতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন অথবা সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করেন, তবে বিজ্ঞাপনদাতা এবং সম্প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বাণিজ্যিক ব্যবহার : রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ভবন বা স্থাপনা, যেমন— জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, আদালত বা আদালতের কার্যক্রম, সেনানিবাস এলাকা এবং কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা ইত্যাদি কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে প্রদর্শন করা যাবে না। এই নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো বিজ্ঞাপনে এসব স্থাপনা প্রদর্শন করলে সম্প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
সামরিক বা বেসামরিক গোপন তথ্য প্রচার করলে ২ বছরের জেল বা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জুয়া, বাজি, অনুমোদনহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ২ বছরের জেল বা ৩০ লাখ টাকা জরিমানা আর লাইসেন্স ছাড়া সম্প্রচার কার্যক্রম চালালে সংশ্লিষ্টদের ৩ বছরের জেল বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে
সম্প্রচার অপরাধের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ৯০ দিনে মামলার নিষ্পত্তি
খসড়া অধ্যাদেশের ২২ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য সরকার এক বা একাধিক ‘সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করবে। এই অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত যেকোনো অপরাধের বিচার কেবল এই সম্প্রচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন হবে।
একজন বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে এবং সরকার জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিযুক্ত করবে। মামলার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সরকার সময়ে সময়ে এই ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হচ্ছে, ততক্ষণ সরকার দায়রা জজ বা মহানগর দায়রা জজকে এই অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবে। তবে কমিশন থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ এই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে না।
কমিশন থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করলে, ট্রাইব্যুনাল তা বিবেচনা করবে। অভিযোগটি আমলে নেওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকলে ট্রাইব্যুনাল সরাসরি তা খারিজ করে দিতে পারবে। তবে অগ্রসর হওয়ার মতো পর্যাপ্ত কারণ থাকলে, ট্রাইব্যুনাল সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন এমন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অথবা সরকার কর্তৃক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো অপরাধ তদন্তের দায়িত্ব প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্তকার্য সম্পন্ন করবেন এবং অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী অফিসারের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তার নিয়ন্ত্রণকারী অফিসারের অনুমোদন সাপেক্ষে তদন্তের সময়সীমা অতিরিক্ত ১৫ দিন বৃদ্ধি করতে পারবেন। এ সময়সীমার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হলে তিনি কর্তব্যে অবহেলা করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদেশ দিতে পারবেন।
তদন্তকারী অফিসারের লিখিত রিপোর্ট ছাড়া ট্রাইব্যুনাল এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারবে না। ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই অধ্যাদেশ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা বা প্রবিধানমালায় বর্ণিত সব অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হবে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই অধ্যাদেশের অধীনে দায়েরকৃত কোনো মামলায় অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবেন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারক কোনো মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হলে তিনি এর কারণ লিপিবদ্ধ করে বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে হাইকোর্ট বিভাগকে অবহিত করবেন এবং মামলার কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখতে পারবেন। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করা যাবে। এ অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ প্রযোজ্য হবে।
জানতে চাইলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (সম্প্রচার) মো. আলতাফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সম্প্রচার অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
এমজে
