নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা আইন অন্তর্ভুক্তির আহ্বান

প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষের মৃত্যু ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঘটনা ঘটলেও দেশে এখনো সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞানভিত্তিক আইন নেই—এমন বাস্তবতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে একটি পৃথক ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ। সংগঠনটির মতে, বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন সড়ক নিরাপত্তার জটিল বাস্তবতা মোকাবিলায় অপ্রতুল; মানুষের জীবন রক্ষাকে কেন্দ্র করে আলাদা আইনি কাঠামো ছাড়া সড়কে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান বক্তারা। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন সংক্রান্ত প্রথম আইন ছিল ১৯৮৩ সালের মোটর ভিকলস অর্ডিন্যান্স। দীর্ঘদিন ধরে এই আইনে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর ঘাটতি থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নানাবিধ আইনি জটিলতা তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হলেও সেখানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি আইন কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালাও সময়মতো জারি হয়নি, ফলে বাস্তব প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
তারা জানান, ২০২২ সালে সড়ক পরিবহন বিধিমালা জারি করা হলেও সেখানে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত ও অসম্পূর্ণভাবে উল্লেখ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী— বিশেষ করে পথচারী, শিশু, সাইক্লিস্ট, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে, যা এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
বক্তারা বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত আইন অনুযায়ী সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী দ্রুত সাড়ার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইনে এসব বিষয় কাঠামোগতভাবে অনুপস্থিত।
তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর মূল দর্শন হলো— মানুষ ভুল করলেও সেই ভুলের শাস্তি যেন মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব না হয়। বিশ্বের বহু দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সড়কে মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো সড়ক নিরাপত্তা মূলত পরিবহন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ, মানুষের জীবন সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়।
রোড সেফটি কোয়ালিশনের মতে, একটি কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৬ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং ১১.২ অর্জন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত ৪র্থ গ্লোবাল মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন রোড সেফটিতে বাংলাদেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতি— ২০২৭ সালের মধ্যে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন— বাস্তবায়ন করতেও আলাদা আইন প্রণয়ন জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারা বলেন, সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের দায়িত্ব নয়। এ জন্য বহু মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন, পাশাপাশি আইনি স্বীকৃত একটি লিড এজেন্সি গঠন অপরিহার্য। বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে এই বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, মানুষের জীবন রক্ষার মতো অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবিটরের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর ড. মো. শরিফুল আলম, রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ এম খালিদ মাহমুদ, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ডা. মাহফুজুর রহমানসহ কোয়ালিশনের অন্যান্য সদস্যরা।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর রোড সেফটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক কাজী বোরহান উদ্দিন।
টিআই/জেডএস