চাহিদামতো মিলছে না ডিজেল, ট্রিপ কমছে বাসের

দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার সরকারি আশ্বাসের পরও রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে ডিজেলের ‘কৃত্রিম সংকট’। সরকার নির্ধারিত রেশনিং পদ্ধতির চেয়েও অনেক কম তেল পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন গণপরিবহন চালকরা। চাহিদামতো ডিজেল না মেলায় লোকাল ও দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করছেন মালিকরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
সরকারি রেশনিং পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রতিটি লোকাল বাসের জন্য দিনে ৭০–৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসের জন্য ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ৬ ও ৭ মার্চ থেকে অধিকাংশ লোকাল বাস মাত্র ২০–২৫ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসগুলো ৪০–৫০ লিটারের বেশি ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছে না। রোববার (৮ মার্চ) দুপুর ১টা পর্যন্ত রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে।
রোববার সকালে রাজধানীর মহাখালী, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই সংকটের তথ্য জানা যায়। লোকাল বাস চালকরা জানান, যানজটের এই শহরে অন্তত দুটি ট্রিপ সম্পন্ন করতে তাদের দৈনিক ৫০–৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। ১২০ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্ক নিয়ে পাম্পে গেলেও চাহিদার সামান্য অংশ মেলায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল।
একইভাবে দূরপাল্লার বাসের মালিকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সরকারি বরাদ্দ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে পাম্পগুলো থেকে চাহিদার চারভাগের একভাগ তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র ৪০–৫০ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, যা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

বনানী রোডে কথা হয় গুলিস্তান-গাজীপুর পরিবহনের বাসচালক আল আমিনের সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সর্বশেষ তেল নিয়েছি গাজীপুরের হাজীর পুকুর এলাকা থেকে। কিন্তু ২০ লিটারের বেশি তেল নিতে পারিনি। অথচ আমার দরকার ছিল ৫০ লিটার। কম তেল পাওয়ায় ট্রিপের সংখ্যাও কমে গেছে।
প্রভাতী বনশ্রী পরিবহনের চালক মো. হাশেম বলেন, যেখানে আমার ৬০ লিটার তেল লাগে, সেখানে পাচ্ছি ২০ লিটার। দিনে ৩-৪টি ট্রিপ দিতে হয়, কিন্তু সেটা পারছি না। তেল নিতে বারবার পাম্পে যেতে হচ্ছে।
এয়ারপোর্ট পরিবহনের বাসচালক শামসুল বলেন, পাম্পগুলো ২০ লিটারের বেশি তেল দিচ্ছে না। আবার অনেক পাম্পে তেলই নেই। ফলে বারবার পাম্পে যেতে হচ্ছে, এতে সময়ের অপচয় হচ্ছে। অথচ মালিকের নির্দেশ অনুযায়ী ৩টি ট্রিপই দিতে হবে।

দূরপাল্লার একটি পরিবহনের মালিক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের বাসগুলোতে ২৬০ লিটার তেল ধরে। প্রতিদিন ঢাকায় আসা-যাওয়ায় প্রায় ২৯০ কিলোমিটারে ৯০–৯৫ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। গতকাল আমার বাসগুলো মাত্র ১০ লিটার করে তেল নিতে পেরেছে। আজ কোনোভাবে চলছে, তবে ফেরার পথে পর্যাপ্ত তেল না পেলে আগামীকাল বাস চালানো সম্ভব হবে না।
ময়মনসিংহ রুটের সৌখিন পরিবহনের চালক মো. শরিফ বলেন, আমাদের বাসে দিনে ৩ ট্রিপে ১১০–১১৫ লিটার তেল লাগে। সেখানে গতকাল দুই পাম্প মিলিয়ে মাত্র ৮০ লিটার তেল নিতে পেরেছি। এখন ট্রিপ সংখ্যা কমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।
অধিকাংশ পাম্পেই ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তেল না দেওয়ার কারণ খুঁজতে রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্টেশনেই জ্বালানি নেই। রেশনিং পদ্ধতি শুরু হওয়ার আগে অতিরিক্ত জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় এসব ফিলিং স্টেশনে মজুদ শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় তেলবাহী গাড়ি আসেনি বলেও জানিয়েছেন কর্মীরা।
বিমানবন্দর সড়কের ডিএল ফিলিং স্টেশনে অকটেন ও ডিজেল— কোনটিই নেই। স্টেশনের এক কর্মী ঢাকা পোস্টকে বলেন, সব রকম তেল শেষ। তবে আজ দুপুরের মধ্যে গাড়ি আসার কথা, তখন আবার তেল পাওয়া যাবে।

‘তেল নেই’ এমন সাইনবোর্ড দেখা যায় খিলক্ষেতের ইসরাইল তালুকদার ফিলিং স্টেশনে। সেখানকার কর্মচারী রাকিব বলেন, পাম্পের তেল শেষ। গাড়ি আসলে পাওয়া যাবে। তবে তেলের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ ঠিকঠাক আছে।
এই রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ বাস টঙ্গী-গাজীপুর এলাকা থেকে তেল সংগ্রহ করে। খোঁজাখুঁজির পর দেখা মেলে একটি পাম্পের, যেখানে শুধু ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল। প্রোগ্রেসিভ ফিলিং স্টেশন নামের ওই পাম্পে তেল নিতে আসা গাজীপুর পরিবহনের চালক ইসমাইল বলেন, তেল দরকার ৪০ লিটার, অথচ দিচ্ছে ১০ লিটার। যা দিয়ে বেশিক্ষণ চালানো যাবে না, আবার তেল নিতে হবে।
পাম্পকর্মী আবদুল্লাহ বলেন, আমাদের স্টকের তেল সীমিত, তাই সবাইকে অল্প করে দিচ্ছি। তেলের গাড়ি আসলে আবার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
তেলের কোনো সংকট নেই : বিপিসি
দেশে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, অর্ডার করা তেলবাহী ১৪টি কার্গোর অধিকাংশ কার্গো দেশে পৌঁছেছে। আগামীকাল (৯ মার্চ) আরও কার্গো আসবে। এছাড়া আগাম সংকট এড়াতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা আছে, যা পর্যায়ক্রমে দেশে আসছে। সুতরাং আসন্ন ঈদ ঘিরে তেল সংকটের কোনো সম্ভাবনা নেই।
শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু। তিনি বলেছেন, আগামী ৯ মার্চ আরও ২টি ভেসেল আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বর্তমানে সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে ভয়ের কিছু নেই। অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখেই আমরা রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছি। কিন্তু মানুষ ভয় পেয়ে মজুদ শুরু করেছে। আসলে আমাদের তেলের কোনো অভাব নেই।
/ওএফএ/এমএইচএন/এমএসএ