লাশ কখন নেবেন— ফোনের ওপাশের কথা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রাকিবের বাবা

‘ছেলেটা বলছিল, ঈদের সময় বাড়ি এলে আমার জন্য একটা নতুন পাঞ্জাবি আনবে। এখন আমার ছেলেটাই নেই।’
বলছিলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের গ্যারেজ মিস্ত্রি মো. জাকির হোসেন। তার ছেলে বিমানবাহিনীর সদস্য রাকিব হাসান। সোমবার রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরের একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ফলে বাবার জন্য তার আর পাঞ্জাবি কেনা হয়নি, হয়নি ঈদে বাড়ি ফেরাও।
ছেলের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন গ্যারেজ মিস্ত্রি জাকির হোসেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাকিব হাসান প্রায় পাঁচ বছর আগে বিমানবাহিনীতে এলএসি পদে যোগ দেন। কুর্মিটোলায় এ কে খন্দকার বিমানবাহিনী ঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন তিনি।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মো. জাকির হোসেন। তিনি জানান, ঘটনার আগের দিন রোববার রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল।
জাকির হোসেন বলেন, রাকিব আমাকে বলছিল, এবারের ঈদে বাড়ি আসবে। তখন আমার জন্য একটা নতুন পাঞ্জাবি নিয়ে আসবে। কিন্তু এখন সেই ছেলেটাই আর নাই।
ঘটনার রাতে বিমানবাহিনী থেকে ফোন করে প্রথমে জানানো হয় রাকিব বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তবে তখনো তিনি জানতেন না ছেলেটি আর বেঁচে নেই।
তিনি বলেন, আমি আমার ভাতিজাকে নিয়ে সিএনজি করে হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। তখন বিমান বাহিনীর এক অফিসার ফোন করে বলল, ‘রাকিব মারা গেছে। ছেলের লাশ কখন নেবেন?’
জাকির হোসেন জানান, রাকিব ছিল তার দুই ছেলের মধ্যে বড়। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই ছিল রাকিবের ওপর।
তিনি জানান, রাকিব সংসার চালাতো। তার ছোট ভাই এবার এইচএসসি পরীক্ষায় এ-প্লাস পেয়েছে। রাকিবের স্বপ্ন ছিল ছোট ভাইকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করা আর পরিবারের জন্য একটা ঘর তোলা।
বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই রাকিব বলতেন, আগে পরিবারের জন্য একটি ঘর তুলব, তারপর বিয়ের কথা ভাববো।
এদিকে, একই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আরেক সদস্য আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা। তিনিও একে খন্দকার বিমানবাহিনী ঘাঁটিত কর্মরত ছিলেন। তিনি বিমান বাহিনীর প্রোভস্ট শাখায় কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর সৈয়দপুরের নিচু কলোনী বিমানবন্দর পূর্বপাড়া এলাকায়।
আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা ওই এলাকার আব্দুল হান্নানের বড় মেয়ে। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন ৪ বছর আগে।
ঘটনার দিন তিনি ঢাকার মিরপুরের ওই বাণিজ্যিক ভবনের একটি শপিং মলে গিয়েছিলেন। দুপুরে হঠাৎ আগুন লাগলে অনেকের সঙ্গে তিনিও ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতেই তার মৃত্যু হয়।
অনন্যার চাচা আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাদের পরিবার খুব গরিব। অনন্যা চাকরি পাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা কিছুটা স্বচ্ছল হয়েছিল। ঘটনার পর বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষ ফোন করে অনন্যার ছোট বোন সূর্বণাকে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেয়। পরে বিষয়টি জানার পর তার বাবা-মা ও ছোট বোন ঢাকায় যান। রাতেই তারা খবর পান, অনন্যা হাসপাতালে মারা গেছেন।
এদিকে দুই জনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শ্বাসকষ্টজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, আগুন লাগা ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত একটি কাপড়ের দোকান থেকে রাকিবসহ কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আগুন লাগার পর ভবনে প্রচণ্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। ফলে অনেকেই ভবনের ছাদে উঠে যান। যারা ছাদে উঠতে পেরেছিলেন তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে রাকিব ও অন্যজন ছাদে পৌঁছাতে না পারায় ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে দুই জনের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আগের দিন বিকেলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে করে তাদের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছিল।
এ বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মো.আহসান সোহেল সৌরভ বলেন, মরদেহ দুই পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তবে আমরা আমাদের আইনি কার্যক্রম চলমান রেখেছি।
রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে অবস্থিত ‘এলএ প্লাজা’ নামের ১১ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবনে গত সোমবার দুপুরে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে ভবনটির তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে আরও দুটি ইউনিট যোগ দিলে মোট ছয়টি ইউনিট আগুন নেভাতে কাজ করে।
ফায়ার সার্ভিস আরও জানায়, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বেলা ৩টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে তা পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। আগুন লাগার পর ভবনের ভেতরে থাকা অনেকেই আতঙ্কে ছাদে উঠে যান, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন তলায় আটকা পড়ে পড়েন।
ফায়ার সার্ভিসের মিরপুর স্টেশনের কর্মকর্তা শাজাহান সিরাজ সাংবাদিকদের জানান, আগুন লাগার পর টার্ন টেবিল ল্যাডার (টিটিএল) ব্যবহার করে ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন তলা থেকে ১৪ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একজন নারী ও একজন পুরুষকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারা ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, বেলা ১টা ৫২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় তারা। প্রথমে চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে আরও দুটি ইউনিট যোগ দেয়। তাদের চেষ্টায় বেলা ৩টা ২২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিভে যায়। আগুন লাগার পর ১১ তলা ভবনের ভেতরে থাকা অনেকেই ছাদে উঠে যান। কেউ কেউ বিভিন্ন তলায় আটকা পড়েন। পরে ২৪ জনকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এই দুই জনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ায় তাদেরকে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এমএসি/এনএফ