দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার আহ্বান

বঙ্গোপসাগরসহ দেশের যেসব স্থানে তেল-গ্যাসের খনি রয়েছে, সেখান থেকে তা উত্তোলন ও ব্যবহারে উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নেওয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৪ মার্চ) পান্থপথে ঢাকা স্ট্রিমের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ঢাকা স্ট্রিমের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া। তিনি এ সময় ১৩ দফা দাবিও উত্থাপন করেন।
বিজ্ঞাপন
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাতের বদলে সেবা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমানো এবং নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌরবিদ্যুৎ) ব্যবহার বৃদ্ধি, কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল বা নবায়ন না করা।
এছাড়া উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও লুটপাটের বিচার করা এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোসহ বিইআরসিকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার দাবিও ছিল।
গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করেন ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন।
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জ্বালানিরসঙ্গে কৃষির সরাসরি সম্পর্ক। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচের খরচ বাড়ে, সারের দাম বাড়ে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। জ্বালানি নীতি করার সময় আমাদের কৃষক এবং নারীদের কথা মাথায় রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, বিগত দিনে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। ইনডেমনিটি আইন বা স্পিডি সাপ্লাই অ্যাক্ট করে এই লুটপাটকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যারা এই চুক্তির সাথে জড়িত ছিল, তাদের খুজে বের করতে হবে। আমাদের একটি ‘ট্রুথ কমিশন’ বা ‘শ্বেতপত্র’ করা দরকার যাতে জাতি জানতে পারে কোথায় কত টাকা লুট হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও এখনই মনোযোগ দিতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রধান নির্বাহী ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা বারবার স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের কথা বলছি। ক্যাপাসিটি চার্জের যে ভূত, সেটা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এটি মূলত ধনীদের জন্য একটি ভর্তুকি। আমরা উৎপাদনের দিকে জোর দিয়েছি, কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় জোর দিইনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা টার্গেট পূরণ করতে পারিনি। সোলার প্যানেল বা যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ শুল্ক ও কর বসানো হয়েছে। সামনের বাজেটে জ্বালানি রূপান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকতে হবে এবং এক্সপ্লোরেশন বা গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাজেট রাখতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, পলিটিক্স ইজ দ্য কমান্ডার। রাজনীতি ঠিক না থাকলে কোনো খাতই ঠিক থাকে না। বিগত সরকার এই খাতকে লুটপাটের আখড়া বানিয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত এই মাফিয়াদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। আদানি চুক্তির মতো দেশবিরোধী চুক্তিগুলো কেন এখনও বাতিল করা হচ্ছে না? আমাদের একটি শ্বেতপত্র দরকার।
বিএনপির চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, এই ১৩ দফা দাবির অনেকগুলোই আমাদের কোর পলিসিরসঙ্গে অ্যালাইন করে। যেমন ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির পরিমাণটা কমিয়ে যতটা সম্ভব রিনিউয়েবল এনার্জির দিকে এগিয়ে যাওয়া। এটি আমাদের জ্বালানি পলিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।
গবেষক ও লেখক মাহা মির্জা বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাওয়ার পরে সেটা থেকে বের হয়ে আসা বা বাতিল করা যে কত কঠিন, আদানি চুক্তি হচ্ছে তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা সিঙ্গাপুর হওয়ার বাসনা থেকে বের হতে পারি নাই। আমাদের উন্নয়ন মডেলটাই এনার্জি ইন্টেনসিভ। আমরা হুন্দাইয়ের কারখানার কথা বলি, যেখানে ৩০০ লোকের কর্মসংস্থান, অথচ প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে। আমাদের এমন উন্নয়ন মডেলে যেতে হবে যা আমাদের লোকাল অর্থনীতিরসঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের সিভিল সোসাইটির ভয়েসগুলো আরও জোরালো করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু তাদের কাজের ধীরগতি আমাদের হতাশ করছে। জ্বালানি খাতের মাফিয়াদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
ওএফএ/এমএসএ