একই রুট, একই বাসে ঈদ উপলক্ষ্যে দ্বিগুণ ভাড়া

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বাসের টিকিট বিক্রিতে চরম নৈরাজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ যাত্রায় যাত্রীদের জিম্মি করে বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে পরিবহন কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে এসি বাসগুলোতে ৭ দিনের ব্যবধানে ভাড়ার এই বিশাল পার্থক্য দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবহন মালিকরা ফিরতি পথে যাত্রী সংকটের অজুহাত দিলেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা একে অযৌক্তিক বলছেন। এমন অবস্থায় ঈদে ঘরমুখো মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
দেশের বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া অনলাইনে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একই গন্তব্যে একই মানের বাসে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে ভাড়া বাড়ানোর এই বিষয়টি নিয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি দাবি করেছে, নন-এসি বাসে ভাড়া বাড়ানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই এবং জ্বালানি সংকটের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই।
সংগঠনটি জানিয়েছে, কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা–বুড়িমারি রুটে ঢাকা থেকে রাত ৯টায় ‘প্রিমিয়াম স্লিপার এসি’ বাস চালায় ‘বরকত ট্রাভেলস’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ৩০০০ টাকা
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছেন, যাত্রীরা যেন তাকে এ বিষয়ে জানান এবং এর প্রতিকারের দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করবেন।
তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঈদের সময় ফিরতি পথে যাত্রী কম থাকার অজুহাতে ভাড়া দুই থেকে তিন গুণ বাড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিআরটিএ-র পক্ষ থেকে বিশেষ ভাড়া নির্ধারণ এবং মাঠ পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি।

অনলাইনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা–বুড়িমারি রুটে ঢাকা থেকে রাত ৯টায় ‘প্রিমিয়াম স্লিপার এসি’ বাস চালায় ‘বরকত ট্রাভেলস’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ৩০০০ টাকা।
ঢাকা–কাউনিয়া–তিস্তা রুটে ঢাকা থেকে রাত সাড়ে ৯টায় ‘লাকসানা বিজনেস ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘শাহ আলী পরিবহন’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ২৫০০ টাকা।
ঢাকা–লালমনিরহাট রুটে ঢাকা থেকে রাত ১০টা ২০ মিনিটে ‘ইকোনমি ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘এস.আর ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১০০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১৬০০ টাকা।
ঢাকা–পঞ্চগড় রুটে ঢাকা থেকে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ‘ইকোনমি ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘শ্যামলী পরিবহন’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১০০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১৬০০ টাকা।
একই রুটে ঢাকা থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিটে ‘হিনো–ওয়ানজে, নন-এসি’ বাস চালায় ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১২০০ টাকা।

ঢাকা–চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ঢাকা থেকে দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে ‘বিজনেস কাম স্লিপার বাস–এএল/১২এম, এসি’ মডেলের বাস চালায় ‘এভারগ্রিন ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ৯০০ ও ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে উভয় ক্ষেত্রেই করা হয়েছে ২০০০ টাকা।
পাবনাগামী বাসের যাত্রী মারুফ হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকা-পাবনা রুটে সি-লাইন পরিবহন নন-এসি বাসে নিয়মিত ৫০০ টাকা করে ভাড়া নিয়ে থাকে। আজ (১৪ মার্চ) দুটি আসনের ভাড়া নিয়েছে ১৩০০ টাকা। অর্থাৎ অন্যান্য সময়ের তুলনায় আসনপ্রতি ১৫০ টাকা করে বেশি নিয়েছে। ঈদ এলেই সব পরিবহন ভাড়া বাড়ায় এবং যাত্রীদের জিম্মি করে।

ঢাকা-রাজশাহী রুটে আগামী ১৮ মার্চের টিকিট কেটেছেন গোলাম মর্তুজা। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঈদে রাজশাহী যাওয়ার জন্য এভারগ্রিন পরিবহনে ২০০০ টাকা করে টিকিট কিনেছি, যা নিয়মিত ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি। আগে এই ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। উৎসবের সময় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। এটি পকেট কাটা ছাড়া আর কিছু না।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত ১৩ মার্চ সকালে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করতে এসে সাংবাদিকদের বলেন, কোনো সুযোগ নেই। আমাকে জানাবেন, দায়িত্ব আমার। যখন (বেশি ভাড়া) নিচ্ছে তার একটা প্রমাণ দেবেন, তখন ব্যবস্থা হবে।

তিনি বলেন, আমরা বলেছি কোনো অবস্থাতেই কারণ ছাড়া, সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এবং নির্ধারণ করা ছাড়া কোনো ভাড়া বাড়ানো যাবে না। আমি মালিকদের বলেছি তেলের দাম বাড়বে না, তেল সরবরাহ নিশ্চিত হবে। অতএব টিকিটের দাম বাড়ানো যাবে না। বিক্রিত টিকিট ফেরত দেওয়া যাবে না। তারা বিষয়টিতে একমত হয়েছে।
বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের সংগঠন থেকে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি আমরা সব সময় কঠোরভাবে মনিটরিং করি। কোনো ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না। আমরা বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া এবং মালিক সমিতির চার্ট অনুযায়ী ভাড়া নেই। নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ভাড়া বৃদ্ধির অবকাশ বা সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, নন-এসি বাসের ভাড়া বিষয়ে যাত্রীরা সাধারণত অভিযোগও করে না। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করে এসি বাসগুলো নিয়ে। এসি বাসগুলো মালিক পরিচালিত। কারণ এটাকে অনেক ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। এতগুলো ক্যাটাগরিতে সরকারের পক্ষে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরির কারণে মালিকরা তাদের নিজস্ব বাসগুলোর ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে। এটা প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা কোম্পানির বিষয়। এটার মধ্যে মালিক সমিতির তদারকি করার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেল সংকটের সঙ্গে বাসের ভাড়া বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তেলের দাম বাড়লে যদি বিআরটিএ মিটিং করে জানায়, তখনই কেবল ভাড়া বাড়তে পারে। এই ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। কোনো অবস্থাতেই কেউ কৌশলে যাত্রীদের হেনস্তা বা জিম্মি করবে, এটা হতে দেওয়া হবে না।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঈদের সময় ফিরতি পথে যাত্রী থাকে না এবং দীর্ঘ যানজট থাকে- এটা মালিকদের নিয়মিত একটি খোঁড়া যুক্তি। পুরো বছর তো তারা লাভেই থাকে। ফলে ঈদের সময়ে ভাড়া দুই থেকে তিন গুণ হয়ে যাওয়া মোটেও ঠিক নয়।
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ঈদের সময় ফিরতি পথে যাত্রী না থাকা ও যানজটের বিষয়টি মাথায় নিয়ে বাসের অপারেশনাল ব্যয় ধরে বিআরটিএর উচিত নন-এসি বাসের জন্য একটি বিশেষ ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া। বিআরটিএর যখন মনিটরিং থাকে না, তখনই আসলে অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এসি বাসের ভাড়া মালিকরাই নির্ধারণ করেন। প্রতি কিলোমিটার হিসেবে তারা ভাড়া ঠিক করেন। যেহেতু এই ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করে না, কিন্তু বিশেষ সময়ে মালিকরা যে ভাড়া নিচ্ছেন তা যৌক্তিক কি না, সেটা দেখার এখতিয়ার বিআরটিএ রাখে বলে আমি মনে করি।
/এমএইচএন/এমএসএ