প্রমাণ মিলেছে জেট ফুয়েল চুরির, মূল হোতাকে বদলি

নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এ ঘটনায় পদ্মা অয়েল পিএলসির একটি দল দুদিন ধরে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে যে চারটি গাড়িতে করে তেল কুর্মিটোলা ডিপোতে নেওয়ার কথা, সিসিটিভি ফুটেজে গাড়িগুলোকে সেখানে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। এছাড়া ডিপোর তেল পরিমাপ করেও পরিমাণে কম পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে তেল চুরির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে প্রধান হোতা পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) মো. সাইদুল হককে বদলি করা হয়েছে। রোববার (১৫ মার্চ) পদ্মা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) মীর মো. ফখর উদ্দিনের সই করা একটি অফিস আদেশে তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থার্ড টার্মিনাল প্রজেক্টের ইনচার্জ হিসেবে বদলি করা হয়েছে। একই আদেশে তার জায়গায় দৌলতপুর ডিপোকে ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা মো. রিদওয়ানুর রহমানকে পদায়ন করা হয়েছে।
এর আগে ১৩ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকা পোস্টে 'অস্থিরতার মধ্যে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরি, নেপথ্যে পুরনো সিন্ডিকেট' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরদিন (শনিবার) সকালে পদ্মা অয়েলের তিন সদস্যের একটি টিম ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছে। তদন্ত দলে রয়েছেন পদ্মা অয়েলের উপ মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) ও হেড অব ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্ল্যায়েন্স মো. শফিউল আজম এসিএ, ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহাম্মদ এবং কর্মকর্তা (ইঞ্জি.) কে এম আবদুর রহিম।
বিজ্ঞাপন
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত দল প্রথম দিনেই ডিপোর বিভিন্ন স্থানে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেন। পাশাপাশি তেলবাহী গাড়ির চলাচল সংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে দেখতে বেসামরিক বিমান চলাচল কতৃপক্ষের সিসিটিভি ফুটেজও যাচাই-বাছাই করে। ডিপোতে থাকা তেলও পরিমাপ করে দেখেন তারা। এ সময় ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথাও বলেন তদন্তের দায়িত্বে থাকা পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তারা।

এদিন কার্যক্রম শেষ করার কথা বলে ডিপো ত্যাগ করে তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা ওইদিন রাজধানীতে অবস্থান করেন। পরদিন অর্থাৎ রোববার কাউকে না জানিয়ে আকষ্মিক ডিপোতে পৌঁছে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। এদিন পরিমাপ করে ডিপোতে তেলের পরিমাণ কম পায় তদন্ত দলের সদস্যরা।
তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুদিন ধরে তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে। তদন্ত শেষে তারা প্রতিবেদন জমা দিবেন।
বিজ্ঞাপন
তেল চুরিতে অভিযুক্ত পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তা মো. সাইদুল হকের বিরুদ্ধে তেল চুরির অভিযোগ পুরনো। চাকরিজীবনের বেশিরভাগই সময় ডিপোতে কর্মরত এই কর্মকর্তাকে থামাতে গত বছরের ২০ জানুয়ারি সতর্ক করে চিঠি দেয় পদ্মা অয়েল কতৃপক্ষ।
এই চিঠির পর দমে যাননি সাইদুল হক। সবশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা ডিপো থেকে ধারাবাহিকভাবে চুরির অভিযোগে ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। তদন্তের অংশ হিসেবে গত ৮ মার্চ পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা ডিপোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জানা গেছে, সনদ ও স্বাক্ষর জালিয়াতি আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনে দুর্নীতি দমন কমিশনে পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তা সাইদুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত চলমান রয়েছে। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ২০১৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত থাকাকালে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সময় জাল বেতন সনদ দাখিল করেন।
এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সাইদুল হককে সাত কর্মদিবসের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। তবে পরবর্তীতে এই অভিযোগের কোনো নিষ্পত্তি করা হয়নি। তবে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই ২০২০ সালে তাকে উপ-ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চাঁদপুর ডিপোর ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তেলে মিশ্রণ এবং ডিলার ও পরিবেশকদের কম মাপ দেওয়ার অভিযোগে সাইদুল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাইদুল হক পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া নেতা মো. আমিনুল হকের ছোট ভাই। সাইদুল হকের ঢাকার বনানী এলাকায় দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। একটি ফ্ল্যাটে তার পরিবার বসবাস করে এবং অপরটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট দুটির আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। পাশাপাশি তিনি একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন।
এমআর/এমএসএ