রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গত দেড় বছর ধরে ‘মঈন বাহিনীর’ চাঁদাবাজি ও ত্রাসের রাজত্ব চলছে। প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলামের সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে সম্প্রতি ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মূলহোতা মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু এই হাসপাতালই নয়, এলাকার প্রায় ৬০টি হাসপাতাল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি এবং এমনকি সরকারি জমিও এই বাহিনীর দখলের মুখে পড়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবার পরিচালনার মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করা এই চক্রের কবল থেকে রেহাই পাননি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরাও।
সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গত দেড় বছর ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘মঈন বাহিনী’। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই বাহিনীর চাঁদাবাজির পরিধি ও ধরণ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মঈনের নির্দেশে শেরেবাংলা নগর এলাকার প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই চক্রটি তাদের অপরাধের জাল আরও সুসংগঠিত করে। গত নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদার পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চাঁদা না দিলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা দখলের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মঈন বাহিনীর কর্মকাণ্ড কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি শেরেবাংলা এলাকায় জমি দখল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি দখল এবং মাদক কারবারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি ও কার্যক্রমের ওপরও তাদের হস্তক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে। এলাকার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এই বাহিনীর সদস্যরা মাদকের আসর বসায় এবং মাদক কেনাবেচা করে।
বিজ্ঞাপন

শেরেবাংলা নগর এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মঈন উদ্দিন কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করছে। কেউ এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও নাজেহাল করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক বলেন, ‘এই বাহিনীর অত্যাচারে গত দেড় বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ। নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিত। নির্বাচনের পর থেকে একলাফে তা ১ লাখ টাকা করেছে। চাঁদা না দিলে মেরে ফেলাসহ প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার হুমকি দেয়। আর আইনি সহায়তা নিলে আরও খারাপ হবে বলেও ভয় দেখায়।’
শেরেবাংলা নগর এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মঈনের নেতৃত্বে কয়েকটি কিশোর গ্যাং আছে, যারা মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে লিপ্ত। এলাকার মোড়ে মোড়ে গাঁজা ও ইয়াবার আসর বসে। ভয়ে কেউ তাদের কিছু বলতে পারে না। সম্পূর্ণ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে মঈন।

গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা যায়, মঈনের অপরাধ জগতে তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী আছেন। তার প্রধান সহযোগী হলো মাইনুদ্দিন। এছাড়া বাকি সহযোগীরা হলেন মোশাররফ, জসীম, মোহন, মামুন ও ফালান। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
এদিকে র্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মঈন বাহিনীর অপরাধ ও চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে তারা।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, শেরেবাংলা নগর থানায় মঈন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া আর কোনো অভিযোগ পড়েনি। আমরা ভুক্তভোগীদের বলব অভিযোগ দিতে, আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।
এদিকে সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালের চাঞ্চল্যকর চাঁদাবাজি মামলার প্রধান অভিযুক্ত মঈনসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
র্যাব জানায়, চাঁদাবাজির খবর প্রকাশের পরপরই রাত আনুমানিক ১টা ৪০ মিনিটে র্যাব-২ এর একটি দল ঘটনাস্থল সিকেডি হাসপাতালে অভিযান চালায়। এ সময় ভুক্তভোগী চিকিৎসক ডা. কামরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও সংগ্রহ করা হয়।

পরবর্তীতে র্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে। তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সুমন ও লিটনকে শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-২। এ ঘটনায় আরও জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাব-৪ পৃথক অভিযানে মো. ফালান মিয়া (৪২), মো. রুবেল (৪২), মো. স্বপন কাজী (৩৬) ও মো. শাওন হোসেন (২৫)-কে গ্রেপ্তার করে।
র্যাব আরও জানায়, সবশেষে চাঁদাবাজি মামলার মূলহোতা মঈন উদ্দিনকে (৪২) নড়াইল জেলার কালিয়া থানাধীন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৬।
এর আগে, ১১ এপ্রিল সিকেডি হাসপাতালের ওটি ইনচার্জ আবু হানিফ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন মঈনকে এক নম্বর আসামি করে একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, মঈন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে আসছে। দাবিকৃত চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আসামিরা তাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ এপ্রিল সকালে শেরেবাংলা নগর থানাধীন শ্যামলী ৩ নম্বর রোডে তার বাসার সামনে এসে দরজা খুলতে বলে। তার স্ত্রী দরজা খুলে দিলে আসামি মঈন বলে যে, চাঁদা বাবদ এখনই তাদেরকে ৫ লাখ টাকা প্রদান করতে হবে। টাকা না দিলে তাকেসহ তার স্ত্রীর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দেয়।
বাদী আরও উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী আসামিদের দাবি করা চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা উশৃঙ্খল আচরণসহ চেঁচামেচি শুরু করে। এ সময় তিনি আসামিদের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসার অন্য একটি রুমে অবস্থান করেন এবং পরিস্থিতির অবনতি আশঙ্কা করে হাসপাতালে অবস্থানরত ছোট ভাই মো. মনির তালুকদারকে (৩৫) দ্রুত বাসায় আসার জন্য ফোন করেন। পরবর্তীতে তার ভাই বাসায় পৌঁছালে আসামি মঈনসহ অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জন আসামি ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আরও লোকজন জড়ো করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন লোক সমবেত করে সিকেডি হাসপাতালের সামনে এসে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তারা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে, উচ্চস্বরে স্লোগান দেয়, গালাগালি করে এবং পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালায়।
এজাহারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, এমনকি তারা সিকেডি হাসপাতালের মালিক মো. কামরুল ইসলামকে উদ্দেশ্য করে হুমকিসূচক স্লোগান দিতে থাকে। এছাড়াও তারা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে এবং পুরো ঘটনাটিকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তারা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, যার ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। উক্ত ঘটনার বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশকে সংবাদ দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এমএসি/এমএসএ
