রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ করেন এক তরুণী। সেই অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে সিরিয়াল এক যৌন অপরাধীর খোঁজ পেয়েছে পুলিশ। গত দেড় মাসে একই ধরনের ১০ ভুক্তভোগীর সন্ধান পেয়েছে তারা। ভুক্তভোগীর বেশিরভাগই মিরপুর এলাকার।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী এই তথ্য জানান।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, যাত্রাবাড়ী থানায় একটি অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করি। প্রথম অভিযোগটি ছিল একজন তরুণীকে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তারের পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসতে থাকে। এখন পর্যন্ত আমরা মোট ১০টি অভিযোগ পেয়েছি, আর আসামি নিজে ১৩টি ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন।
সব প্রতারণার ধরণ একই উল্লেখ করে ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, সবগুলো ঘটনার ধরন প্রায় একই। তিনি ভুক্তভোগীদের ব্ল্যাকমেইল করতেন, কখনো ধর্ষণ করতেন, আবার কখনো ভিডিও ধারণের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতেন। যেসব ভুক্তভোগীকে পেয়েছি, তারা সবাই মূলত মিরপুর এলাকার। ঘটনাগুলোর ধরন শুনলে বোঝা যায় বাংলাদেশে এই ধরনের আচরণ খুবই অস্বাভাবিক। আমাদের কাছেও এটি একটি ভিন্নধর্মী মামলা।
বিজ্ঞাপন

মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, এই আসামির অপরাধের ধরন ছিল বেশ সুকৌশলী। তিনি প্রথমে কোনো একজন নারীকে লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) বানাতেন। শুরুতে কৌশলে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনটি হাতিয়ে নিয়ে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতেন। এরপর সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ওই নারীর বন্ধু তালিকায় থাকা অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতেন। এভাবে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে পরবর্তীতে নানা অজুহাতে তাঁদের ঘরের বাইরে ডেকে নিতেন তিনি।
ওয়ারী বিভাগের ডিসি আরও বলেন, তারপর তিনি নিজেই কখনো ওই আত্মীয় সেজে সিএনজি বা অন্য বাহনে উঠে ভুক্তভোগীকে নিয়ে যেতেন। সাধারণত তিনি মেট্রো স্টেশন এলাকা বা সচিবালয়ের আশপাশে ভুক্তভোগীদের ডেকে নিতেন। পরে যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ সংলগ্ন এলাকায় দুটি বাসায় নিয়ে যেতেন। দিনের বেলায় একটিতে, রাতের বেলায় আরেকটি বাসায় নিয়ে যেতেন। সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিসি বলেন, বাসায় নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের ব্ল্যাকমেইল করতেন, মোবাইল ফোন কেড়ে নিতেন। মোবাইল নেওয়ার পর সেটি বিক্রি করার আগে ভুক্তভোগীর সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিজের দখলে নিতেন। এরপর সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নতুন ভুক্তভোগী খুঁজে বের করতেন। এই ঘটনাগুলোর সময়সীমা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। ৪ মার্চ আমরা প্রথম জিডি পাই এবং সর্বশেষ ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এই দেড় মাসের মধ্যে ১০টি অভিযোগ এসেছে।
বিজ্ঞাপন
পরিচয় তুলে ধরে ওয়ারী বিভাগের ডিসি বলেন, প্রতারকের নাম রাশেদুল ইসলাম রাব্বি। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৩ এপ্রিল রাশিদুল ইসলাম রাব্বি (৩০) নামে ওই প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তিনি কোনো কাজ করতেন না, এই অপরাধ করেই আয়-রোজগার করতেন। একজন ভুক্তভোগীকে টার্গেট করে তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার, কানের দুল, মোবাইল ফোন, নগদ টাকা এমনকি ব্যাংকের অর্থ পর্যন্ত হাতিয়ে নিতেন তিনি। এখন পর্যন্ত পাঁচটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছি। ধারণা করছি, আরও মোবাইল উদ্ধার হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই শুধু জিডি করতেন উল্লেখ করে মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন সামী বলেন, তদন্ত শুরুর পর প্রথমে অভিযোগ কম পাওয়া গেলেও পরে দেখা যায়, অনেকে সামাজিক সম্মানের ভয়ে সরাসরি অভিযোগ না করে মোবাইল হারিয়েছে উল্লেখ করে জিডি করেছেন। সেই সূত্র ধরে আমরা ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করতে পেরেছি। মিরপুর থানায়ও এ ধরনের বেশ কিছু জিডি রয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তার বলেন, প্রতারক রাব্বির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা হয়েছে এবং আরও তিন-চারটি জিডি তদন্তাধীন রয়েছে। আমরা তদন্ত করে দেখছি, তার কোনো সহযোগী আছে কি না। এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, তার সহযোগী থাকলেও খুব বেশি নয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি খুব বেশি তথ্য দেয়নি। তবে তিনি প্রযুক্তি ব্যবহারে খুবই দক্ষ।
মল্লিক ওয়াসী উদ্দিন সামী বলেন, উদ্ধার হওয়া মোবাইলগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি। প্রতিটি মোবাইলই কোনো না কোনো ভুক্তভোগীর। যখন আমরা নতুন করে যোগাযোগ করি, তখন অনেকেই নিজেকে ভুক্তভোগী বলে জানিয়েছেন। এভাবে এক ভুক্তভোগীর মোবাইল ব্যবহার করে আরেকজনকে টার্গেট করা হয়েছে। সব ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি কিছু ক্ষেত্রে ব্ল্যাকমেইল, কিছু ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা হয়েছে। কারও কাছে বলা হয়েছে, আরও টাকা দিলে ভিডিও ডিলিট করে দেব। তার মোবাইলে কিছু ভিডিও পেয়েছি। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
ওয়ারী বিভাগের ডিসি বলেন, প্রতারক রাব্বি যাকে বিয়ে করেছেন, তাকেও একই কৌশলে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছেন। এমনকি শ্বশুরবাড়িতেও একই ধরনের কাজ করতে গিয়ে একবার ধরা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ থাকলে পুলিশকে জানাতে অনুরোধ করছি।
এসএএ/এমএন
