ক্ষুদ্রঋণ যখন দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার

১৬ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলো একযোগে একটি সম্পাদকীয় ও একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে, যা আমাদের সমাজে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নতুন করে সামনে এনেছে। বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণের অব্যবস্থাপনা ও অপব্যবহারের কারণে প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলায় ঋণের ফাঁদে পড়ে মানুষ ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হয়েছে। মাত্র পাঁচ মাসে ঋণ শোধ করতে না পেরে আটজনের অপমৃত্যু এবং বহু মানুষের এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে—যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একই দিনে প্রকাশিত আরেকটি খবর এই সংকটের আরও ভয়াবহ রূপ তুলে ধরে। কেরানীগঞ্জে এনজিও ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে বিরোধের জেরে স্কুলছাত্রী জোবাইদা রহমান ফাতেমা ও তার মা রোকেয়া রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, শিক্ষিকা নুসরাত মীম একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নেন, যার জামিনদার ছিলেন রোকেয়া। কিস্তি দিতে না পারায় পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত তা দ্বৈত হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। ঋণ যে শুধু আর্থিক চাপ নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করতে পারে—এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ।
এই দুই ঘটনার বাইরেও আমি একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। পরিবারটি আমার নিকটাত্মীয়। পরিবারের ছেলে বিদেশে গিয়ে কাজ করতে না পেরে দেশে ফিরে আসে। পরিবারের উন্নতির আশায় একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ট্রাক্টর কিনে ইটভাটায় ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু ব্যবসা প্রত্যাশিত সফল না হওয়ায় চারটি সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলাফল—থানায় মামলা, পুলিশি হয়রানি এবং শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবার গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করতে বাধ্য হয়।
এই পরিবারের তিন সন্তান, যারা একসময় লেখাপড়া করত, তারাও এখন শ্রমিক। গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরের অনিশ্চিত পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তাদের আচরণেও নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আফ্রিকান একটি প্রবাদ আছে—‘একটি শিশুকে মানুষ করতে পুরো একটি গ্রামের প্রয়োজন হয়।’ গ্রামভিত্তিক সামাজিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুরা আজ শহরের একাকীত্ব, প্রযুক্তির আসক্তি ও কু-সঙ্গের ঝুঁকিতে পড়ছে। এই পরিবারের বড় ছেলেটি ইতিমধ্যে মাদকাসক্তির পথে পা বাড়িয়েছে—যা কেবল একটি পরিবারের নয়, সমাজেরও পরাজয়।
এই তিনটি ঘটনা আমাদের সামনে ক্ষুদ্রঋণের কিছু গুরুতর নেতিবাচক দিক স্পষ্ট করে তুলে ধরে। একাধিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকায় মানুষ সহজেই ‘ঋণের ওপর ঋণ’-এর ফাঁদে পড়ে। উচ্চ সুদের চাপ কিস্তি পরিশোধকে অসহনীয় করে তোলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহকের আয় ও ঝুঁকি বিবেচনা না করেই ঋণ দেওয়া হয়। নিয়মিত কিস্তির চাপ থেকে মানসিক অবসাদ, পারিবারিক কলহ, আত্মগোপন এবং কখনো কখনো আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতি ঘটে। কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারদরের পতনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কিস্তিতে কোনো নমনীয়তা পান না। সর্বোপরি, কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অথচ ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই লক্ষ্যগুলো থেকে ক্ষুদ্রঋণ ক্রমেই বিচ্যুত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে আরও গভীর করছে। মানুষ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও গ্রাম ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
প্রশ্ন হলো—যদি ক্ষুদ্রঋণ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, পারিবারিক বন্ধন ভেঙে দেয় এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে, তাহলে কি এই ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় আসেনি? গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য সামাজিক বন্ধন, মানবিকতা এবং সম্মিলিত প্রয়াস অপরিহার্য। মুনাফা নয়, মানুষ—এই দর্শনকে সামনে রেখে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
মাহিউল কাদির : কলাম লেখক
[email protected]