দেবী সরস্বতী : বিদ্যা, জ্ঞান ও সম্প্রীতির প্রতীক

“তরুণশকলমিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ
কুচভরনমিতাঙ্গী সন্নিষন্না সিতাব্জে।
নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ
সকলবিভবসিন্ধ্যৈ পাতু বাগদেবতা নঃ।।” [তন্ত্রসার (বঙ্গবাসী সং.), পৃ.১৯৭]
অর্থাৎ, যাঁর ললাটে বিরাজিত তরুণ শশীকলা, যিনি শুভ্রবর্ণা, কুচভারাবনতা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, যাঁর এক হস্তে উদ্যত লেখনী ও অপর হস্তে পুস্তক শোভা পায়, সেই বাগ্দেবতা সব বিভব সিদ্ধির নিমিত্ত আমাদের রক্ষা করুন।
বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী। সরস্+ মতুপ্ (বতুপ্) স্ত্রীয়াম্ ঙীপ্ = সরস্বতী। ‘সরস’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো জল বা সরোবর। বাক্য অর্থেও সরস শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। তবে ব্যুৎপত্তিগত অর্থানুসারে জলে বা সরোবরে যে দেবীর অবস্থান, তিনিই সরস্বতী। সরস্বতী দেবীর প্রতিমায় আমরা দেখি তাঁর বাহন হংস এবং তিনি সরসী জলে শ্বেতপদ্মের ওপর অধিষ্ঠিত।
আজ যাঁকে বিদ্যার দেবীরূপে আমরা পূজার্চনা করছি, দীর্ঘ রূপবিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছেন। যুগভেদে নানা নামে তিনি উল্লিখিত এবং পূজিত হয়েছেন—ভারতী, বর্ণেশ্বরী, শারদা প্রভৃতি।
বেদে সরস্বতীর দ্বিবিধ রূপ অত্যন্ত স্পষ্টরূপে প্রতিভাত—ত্রিলোকব্যাপিনী সূর্যাগ্নির দ্যুতি এবং সরস্বতী নদী। এছাড়া অন্নদাত্রী, ধনদাত্রী, বিভবদাত্রীরূপেও সরস্বতী উল্লিখিত। নদীরূপা সরস্বতীর বিলুপ্তি ঘটে বৈদিক যুগের শেষভাগে। কিন্তু নদীরূপে সরস্বতীর মহিমা ভারতবাসীর মনের অতি গভীরে এখনও প্রোথিত।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, জ্যোতীরূপা সরস্বতী ও নদীরূপা সরস্বতী এই দুই রূপই বৈদিক যুগে বর্তমান ছিল। আর, এই দুই রূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে সরস্বতী দেবীর আকার পরিগ্রহ করেছিল।
বৈদিক সাহিত্যে সরস্বতীর নারীরূপ, নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও পরিচিতি প্রদান করে। ধৈর্য্যের পাশাপাশি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য তিনি উচ্চ প্রশংসিত।
দেবতা বা বাগ্দেবী রূপে সরস্বতীর উল্লেখ ঋগ্বেদের কোথাও দৃষ্ট হয় না। ঋগ্বেদে সরস্বতী শব্দটির অসংখ্যবার উল্লেখ রয়েছে নদী হিসেবে। তবে ঋগ্বেদের ২/৪১/১১ নং সূক্তে দেবী হিসেবেও সরস্বতীর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়—‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।’
সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছিল, এখানেই ঋক্মন্ত্রের পাঠ ও সামমন্ত্র গীত হয়েছিল। অর্থাৎ, বৃহত্তর আর্যসভ্যতা গড়ে উঠেছিল এই সরস্বতী নদীর তীর ঘেঁষে। আর্যগণ এখানে শুধু যজ্ঞ করতেন তেমনটি নয়, এর তীরবর্তী তপোবনে বসে ঋষিরা ধ্যান করতেন। গুরু পরম্পরায় চলত বেদের পঠন-পাঠন। আর এ সবের দ্বারাই সরস্বতী নদী জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী হয়েছিলেন। অথর্ববেদে ও বিভিন্ন ব্রাহ্মণ গ্রন্থে বাগাধিষ্ঠাত্রীরূপে সরস্বতীর উল্লেখ আছে।
ইয়ং যা পরমেষ্ঠী বাগদেবী ব্রহ্মসংহিতা।
ঐয়ৈব সসৃজে ঘোরং তয়ৈব শান্তিরস্তু নঃ।। (অথর্ববেদ/১৯/৯/৩)
এই যে বাগ্দেবীর উল্লেখ এখানে দেখা যায়, তিনি এই দেবী সরস্বতী কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগ আসতে আসতে সরস্বতী পূর্ণ বাগ্দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ‘বাক্ হি সরস্বতী’ (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ/৩/২), ‘বাক্ সরস্বতী’ (শতপথ ব্রাহ্মণ/৭/৫/১/৩১) ইত্যাদি।
এসব ব্রাহ্মণের আরও অনেক জায়গায় সরস্বতীকে বাক্ বা বাগ্দেবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবেই ঋগ্বেদের সরস্বতী নদী ব্রাহ্মণের যুগে এসে বাগ্দেবীর রূপ পরিগ্রহ করেন। নিরুক্তকার যাস্কাচার্যও সরস্বতীকে নদী ও দেবতা অর্থে গ্রহণের কথা বলেছেন— “তত্র সরস্বতীত্যেতস্য নদী নিগমা ভবন্তি” (নিরুক্তম্,২/২৩/৩)।
রামায়ণেও সরস্বতী বাণীরূপে উল্লিখিত। পুরাণে ও পুরাণোত্তর যুগে সরস্বতী বাক্য বা শব্দের অধিষ্ঠাত্রী বাগ্দেবীরূপে প্রসিদ্ধ। পরবর্তীকালে সব পরিচয় লুপ্ত হয়ে সরস্বতী দেবী কেবলমাত্র বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
“শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতোপুষ্পোশোভিতা।
শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা ॥
শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা॥”
অর্থাৎ, দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে অসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁর হাতে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা, তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেতালঙ্কারে ভূষিতা।
দেবী সরস্বতীর এই রূপ আমাদের চিরচেনা। বৈদিক সাহিত্যে সরস্বতীর নারীরূপ, নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও পরিচিতি প্রদান করে। ধৈর্য্যের পাশাপাশি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য তিনি উচ্চ প্রশংসিত। তিনি বন্ধুরতা প্রতিরোধ করেন ও কষ্ট সহ্য করতে পারেন।
তিনি ব্রহ্মার সঙ্গী যা এটা নির্দেশ করে যে, জ্ঞান এবং সৃষ্টির মাঝে সঙ্গতি বিদ্যমান। তাঁর শুভ্র বসন ও ভূষণ তাঁর পরম বিশুদ্ধতাকেই নির্দেশ করে। তাঁর চার বাহু চারটি দিককে নির্দেশ করে যা থেকে ধারণা করা হয় যে, সরস্বতী সর্বব্যাপী। তাঁর সম্মুখবাহু বহিঃজগতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আর, পশ্চাৎবাহু আত্মবাদী জগতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
তিনি ব্যক্তিত্বের চারটি উপাদান—মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকারকে ধারণ করেন। বই হলো জ্ঞানের সম্পূর্ণতার প্রতীক। বই বাম হাতে ধারণ করার অর্থ জ্ঞানের অর্জিত প্রয়োগকে মানবব্যক্তিত্বের কোমল অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
আরও পড়ুন
জপমালা মনযোগ/ধ্যানমগ্ন প্রক্রিয়াকে প্রদর্শন করে যা অর্জিত জ্ঞানের সাথে যুক্ত। হংস প্রদর্শন করে বিপরীত শক্তিকে, ভালো আর মন্দকে, অসত্য আর সত্যকে। এর দ্বারা বোঝায় যে, “জগতে বাস করো, তবে জগতের ওপর মোহাচ্ছন্ন হয়ে নয়।”
এটি জীব ও প্রাণের প্রতীক যা শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। হংসটি জলের ওপর একপ্রকার সমাধিরূপে ভাসমান। ময়ূর প্রদর্শন করে জাগতিক জ্ঞানকে, যা পরিবর্তনশীল এবং জাগতিক বাসনার দিকে ধাবিত করে। ময়ূর নির্দেশ করে অবহেলিত কর্মের সম্ভাবনাকে, যা মানবজীবনের ব্যক্তিগত অবস্থানকে অর্থাৎ মস্তিষ্ক ও ডানদিককে প্রভাবিত করে।
সরস্বতী মধ্যে অবস্থান করে এ দুইয়ের মাঝে সমতা বিধান করে। পদ্ম নির্দেশ করে কর্মের মাঝে সমৃদ্ধ জ্ঞানকে, এটি বিবর্তনবাদ ও বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। এটি নিজের পথকে তৈরি করে জীবনস্রোতের ভিত্তিতে এবং তাকে এর পৃষ্ঠে ধাবিত করে—এটি জীবের বাহ্যিক থেকে অভ্যন্তরীণ পথ নির্দেশ করে।
যেহেতু এটি সংগীতকে প্রকাশ করে জগতের মাঝে, তাই বীণা দ্বারা আমাদের ধারণা ও কর্মের সংগৃহীত স্বরকে বোঝায়। এটি জ্ঞানের অপসারণকে চিহ্নিত করে ও জ্ঞানার্জনকে কেন্দ্রীভূত করে। বীণার ওপরে বামহাত স্থাপন করে হৃদয়ের নিকটে আনার অর্থ হলো জ্ঞান সর্বদা অপরের হিতসাধনে ব্যবহার করা উচিত।
ডানহাত পাদদেশে প্রতিস্থাপন দ্বারা বোঝায় বিপরীত জ্ঞানকে সর্বদা নিয়ন্ত্রণে রাখা। বীণা নির্দেশ করে জ্ঞানের সম্ভাব্য ভালো ও মন্দ উদ্দেশ্যকে, যা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর যিনি, তিনি কোন জ্ঞানকে ধারণ করবেন।
একটি বিশেষ প্রকার বীণা আছে যাকে “সরস্বতী বীণা” নামে অভিহিত হয়। সরস্বতী বীণা জগতের সর্বপ্রাচীন বাদ্যযন্ত্রগুলোর একটি। এটি তুত যন্ত্র যা চার অক্টেভে স্বর উৎপন্ন করে। চারটি তার মূল অংশের সাথে যুক্ত আর তিনটি অতিরিক্ত তার ব্যবহৃত হয় তাল মাপার জন্য/ধ্বনির পরিক্রমণের জন্য।
ডানদিকের ঢাকটি শব্দবাক্স আর বামদিকেরটি সহায়ক অংশ; এর লক্ষ্য হলো সুমধুর প্রবহমান সুর/তান সৃষ্টি করা যা অন্তর্গত জ্ঞানকে জাগ্রত করে তোলে। বীণা কণ্ঠগত যোগ্যতা/গায়কী প্রদান করে যা স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি করে গানের প্রবাহ দ্বারা। বীণাকে সুষুম্না বলা হয়। আর অন্তরের গভীরের জ্ঞানকে আবাহন করে উন্মন্থন করার জন্যই সংগীতের সৃষ্টি।
সরস্বতী দ্যুতির্ময়ী। দ্যুতি মানেই আলো অর্থাৎ, সব অন্ধকারের অবসান। আমরাও কার্যত আলোর সন্ধানই করি দেবী সরস্বতীর আরাধনার মাধ্যমে। জ্ঞানের আলোর সন্ধান। জ্ঞানের আলো মানুষের মনের সব অন্ধকারকে দূরীভূত করে প্রকৃত মনুষ্যত্বের গুণে গুণান্বিত করে তোলে।
সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যজ্যোতি তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করে বলেই মানুষের প্রকৃত চেতনা ও জ্ঞানের কর্ত্রী দিব্য-সরস্বতী। সরস্বতী দ্যুতির্ময়ী। দ্যুতি মানেই আলো অর্থাৎ, সব অন্ধকারের অবসান। আমরাও কার্যত আলোর সন্ধানই করি দেবী সরস্বতীর আরাধনার মাধ্যমে। জ্ঞানের আলোর সন্ধান। জ্ঞানের আলো মানুষের মনের সব অন্ধকারকে দূরীভূত করে প্রকৃত মনুষ্যত্বের গুণে গুণান্বিত করে তোলে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তাঁর আরাধনায় বিদ্যা লাভ হয়, এই বিশ্বাস হৃদয়ে লালন করেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সরস্বতী দেবীর আরাধনায় ব্রতী হন। বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে শিক্ষার্থীরা সরস্বতী পূজায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীনভাবে বিদ্যালাভের সুযোগ পায়।
সাধারণত যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা রয়েছে, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার আয়োজন হয়ে থাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা সরস্বতী পূজার আয়োজন করলেও, মূলত এই আয়োজনে আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখতে পাই।
এই আয়োজনটি তখন যেন বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীর সম্মিলিত আয়োজনে পরিণত হয়। সরস্বতী পূজা উপলক্ষে সব শিক্ষার্থী ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে একটি সমন্বিত আয়োজনে নিজেদের ব্রতী করে। এ যেন এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।
সরস্বতী পূজার এই সম্মিলিত আয়োজন আমাদের আশাবাদী করে। ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এ যেন শিক্ষার্থীদের একতার বার্তা। এ যেন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের আয়োজন নয়, এ যেন বাংলার শিক্ষার্থী সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিগন্ত প্রসারিত বার্তা। এই আয়োজনটি আজ আর শুধুমাত্র ধর্মীয় কোনো আচার-অনুষ্ঠান নয়, এটি আজ বাংলার আবহমান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সময়ের পথপরিক্রমায় সরস্বতী পূজার এই আয়োজনটি আরও ব্যাপকতা লাভ করবে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীসমাজ সম্মিলিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই আয়োজনকে সফল করবে, একটি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ গঠনে এই আয়োজন সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে—এই প্রত্যাশা রইল।
ড. সঞ্চিতা গুহ : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
