ডুমস্ক্রলিং কী, আচরণগত পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

২২ বছরের সাকিব (ছদ্মনাম)। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। লেখাপড়ায় ভালোই ছিল। ইদানীং অনবরত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট দেখতে থাকে, যার বেশিরভাগই নেতিবাচক, ভীতিকর বা উদ্বেগজনক। সাকিব নিজেকে অনেকখানি গুটিয়ে নিয়েছে।
একা একা থাকে, রাতে ঘুমায় না। ভোরে ঘুমায়, আর বেলা ২টা ৩টার দিকে ঘুম থেকে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সাথে রূঢ় আচরণ করে, কথায় কথায় মায়ের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলে। ঠিকমতো নিজের যত্নও নেয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তার রেজাল্টও খারাপ হচ্ছে।
শুধু সাকিব নয়, যেকোনো বয়সের নারী, পুরুষ সম্প্রতি মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে এধরনের কন্টেন্টের প্রতি আসক্ত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
একের পর এক ভিডিও, ছবি বা সংবাদ স্ক্রলিং করেই যাচ্ছে। এমনকি তিনি নিজেও জানেন এই ধরনের কন্টেন্ট মোটেও সত্য নয়, তারপরেও ক্রমাগত স্ক্রলিং থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারছেন না। এভাবে নেতিবাচক এবং মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কন্টেন্ট বারবার দেখাকেই বলে ডুমস্ক্রলিং। এটি একটি আচরণগত সমস্যা।
মহামারি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মানুষ অনবরত নেতিবাচক খবর পড়তে থাকে, যা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। ডুমস্ক্রলিং হচ্ছে—স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে অনবরত নেতিবাচক, ভীতিকর বা উদ্বেগজনক সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট স্ক্রল করে দেখা, যা মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে।
ব্যক্তি জানেন যে এই অভ্যাস তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, উদ্বেগ বাড়ছে—তবুও তিনি নিজেকে থামাতে পারেন না। এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে মানুষের ‘নেতিবাচক বিষয়ে আগ্রহ’—অর্থাৎ ইতিবাচক তথ্যের তুলনায় নেতিবাচক তথ্যের প্রতি আমাদের মনোযোগ বেশি আকৃষ্ট হয়।
পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এর জন্য দায়ী। একবার বা কয়েকবার যে ধরনের কন্টেন্ট মানুষ বেশি স্ক্রল করে পরবর্তীতে সে ধরনের কনটেন্টই তার সামনে বেশি আসতে থাকে। ফলে ডুমস্ক্রলিং চক্রে পড়ে ব্যবহারকারীর উদ্বেগ বাড়ে, উদ্বেগ কমাতে আরও কন্টেন্ট দেখা বা পড়া হয়, কিন্তু তাতে উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।
ডুমস্ক্রলিং কেন ঘটে?
ডুমস্ক্রলিংয়ের পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে—
১. নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো: সংকটের সময় মানুষ পরিস্থিতি বোঝার জন্য বেশি তথ্য খোঁজে; নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়; উদ্বিগ্নতা কমাতে বারবার স্ক্রলিং করতে থাকে।
২. ভয় ও আত্মরক্ষামূলক প্রবৃত্তি: খারাপ খবর জানলে নিজেকে প্রস্তুত রাখা যাবে—এই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বারবার নেতিবাচক সংবাদ খুঁজতে থাকে।
৩. ডোপামিন ও রিওয়ার্ড সিস্টেম: নতুন তথ্য পাওয়ার পর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বাড়ে যা তাকে সাময়িক সুখানুভূতি দেয়, রিওয়ার্ড সিস্টেম উদ্দীপ্ত হয় এবং সেই সুখানুভূতির জন্য বারবার একই আচরণ করতে থাকে।
ডুমস্ক্রলিং হচ্ছে—স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে অনবরত নেতিবাচক, ভীতিকর বা উদ্বেগজনক সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট স্ক্রল করে দেখা, যা মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম: যিনি এ ধরনের স্ক্রলিং করতে থাকেন, তার জন্য তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই নেতিবাচক কন্টেন্ট বারবার তার সামনে আসতে থাকে-যাকে বলা হয় ইনফিনিট স্ক্রোল। ফলে এই ডুমস্ক্রলিং বাড়তেই থাকে।
৫. একাকীত্ব ও মানসিক চাপ: কোনো কারণে একাকিত্বে ভুগলে, মানসিক চাপ বাড়লে বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক দক্ষতা কমতে থাকে। সত্যিকারের সামাজিক যোগাযোগ পরিহার করে সে তখন ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম’-এ বেশি সময় কাটায় ফলে ডুমস্ক্রলিং বাড়তে থাকে।
৬. নেগেটিভিটি বায়াস: মানুষ ইতিবাচক তথ্যের তুলনায় নেতিবাচক তথ্য বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি বিবর্তনগত কারণে তৈরি—বিপদের খবর জানা মানে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানো। কিন্তু আধুনিক যুগে এই প্রবণতা অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়।
ডুমস্ক্রলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব:
ডুমস্ক্রলিং আমাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলে।
১. মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি
ডুমস্ক্রলিং দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায়। নেতিবাচক খবর মস্তিষ্ককে ক্রমাগত ‘হুমকি’ বা ‘থ্রেট’ অবস্থায় রাখে, ফলে কর্টিসল নামের হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফল হিসেবে—অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা বাড়ে, মন খারাপ থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিমাত্রায় ভয় তৈরি হয়।
আরও পড়ুন
২. ঘুমের সমস্যা
রাতে ঘুমানোর আগে ফোনে নেতিবাচক খবর পড়লে মস্তিষ্ক উত্তেজিত থাকে। ঘুমের আগে ঘুমের আগে স্ক্রিনটাইম আমাদের মেলাটোনিন নামের হরমোনের নিঃসরণ কমায়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, ঘুমের গুণগত মান কমে যায়, ফলে পরেরদিন মেজাজ খিটখিটে থাকে; কাজে বা পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায়।
৩. মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া
ডুমস্ক্রলিং মনোযোগ কমিয়ে দেয়। কাজ বা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ফোন দেখার অভ্যাস গভীর মনোযোগে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে
কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগে, ভুলের পরিমাণ বাড়ে, সৃজনশীলতা কমে যায়, পরীক্ষার ফল খারাপ হতে থাকে।
৪. শারীরিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। যেমন মাথাব্যথা ও ঘাড়ব্যথা বাড়ে, চোখে জ্বালা ও দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়, হজমের সমস্যা তৈরি হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়।
৫. সামাজিক সম্পর্কের অবনতি
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মানসম্পন্ন সময় কমে যায়। মানুষ শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকে, যা সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়।
৬. বাস্তবতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা
ডুমস্ক্রলিংয়ের ফলে মানুষ মনে করতে শুরু করে যে পৃথিবী কেবলই বিপদে ভরা। ইতিবাচক ঘটনা চোখে পড়ে না, ফলে হতাশাবাদী মনোভাব বাড়তে থাকে।
৭. মেজাজের পরিবর্তন
ডুমস্ক্রলিং-এর কারণে মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
ডুমস্ক্রলিং প্রতিরোধে করণীয়:
ডুমস্ক্রলিং পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হলেও সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যৌক্তিক ও ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে ডুমস্ক্রলিং কমানো যায়—
১. সচেতনতা বৃদ্ধি
প্রথম ধাপ হলো নিজের আচরণ চিহ্নিত করা। কখন, কেন এবং কতক্ষণ ডুমস্ক্রলিং করছেন—তা লক্ষ্য করুন। সচেতনভাবে নিজের আচরণ পরিবর্তন করুন।
কোনো কারণে একাকিত্বে ভুগলে, মানসিক চাপ বাড়লে বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলে মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক দক্ষতা কমতে থাকে। সত্যিকারের সামাজিক যোগাযোগ পরিহার করে সে তখন ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম’-এ বেশি সময় কাটায় ফলে ডুমস্ক্রলিং বাড়তে থাকে।
২. সময়সীমা নির্ধারণ
সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। দিনে এক বা দুইবার বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে খবর পড়াই যথেষ্ট। টাইম লিমিট করুন।
৩. নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ
অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন, বিশেষ করে ‘ব্রেকিং নিউজ’ অ্যালার্ট। এতে অকারণে বারবার ফোন ধরার প্রবণতা কমবে।
৪. নির্ভরযোগ্য ও সীমিত উৎস বেছে নেওয়া
সব খবরের উৎস সমান নয়। গুজব বা অতিরঞ্জিত শিরোনাম এড়িয়ে চলুন। কয়েকটি বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকুন।
৫. ইনফিনিট স্ক্রল ভাঙুন
সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্দিষ্ট সময় শেষে অ্যাপ বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৬. বিকল্প স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা
ডুমস্ক্রলিংয়ের সময়টুকু অন্য কাজে ব্যবহার করুন। যেমন বই পড়া, হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম, গান শোনা, প্রিয়জনের সাথে কথা বলা, প্রার্থনা বা ধ্যান করা।
৭. ঘুমের আগে ডিজিটাল ডিটক্স
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করুন। এই সময়টিকে ‘স্ক্রিন-ফ্রি’ সময় হিসাবে ধরুন।
৮. মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
মাইন্ডফুলনেস, ব্রিদিং এক্সারসাইজ ও মেডিটেশন উদ্বেগ কমাতে সহায়ক। নিয়মিত এসব চর্চা ডুমস্ক্রলিংয়ের তাড়না কমায়।
৯. সামাজিক সংযোগ বাড়ানো
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। বাস্তব জীবনের সংযোগ মানসিক নিরাপত্তা বাড়ায় এবং অনলাইন নির্ভরতা কমায়।
১০. পেশাদার সহায়তা নেওয়া
যদি ডুমস্ক্রলিং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে, তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ : অধ্যাপক, চাইল্ড এডোলেসেন্ট ও ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর