বদলাচ্ছে নেতা, মনের বদল কবে?

ডিন কুন্টজ-এর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘লাইটনিং’ পড়ে শেষ করলাম এই সেদিন। স্পয়লার এলার্ট! উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র স্তেফান। নাৎসি গোপন পুলিশ ‘গেস্টাপো’র সদস্য। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার বছরখানেক আগে জার্মানরা টাইম ট্রাভেল উদ্ভাবন করেছে। স্তেফান প্রথম কালো পরিব্রাজক। মজার বিষয় হলো এই মেশিনে অতীত কালে ভ্রমণ করা যায় না। কারণ অতীত অলঙ্ঘনীয়। যাওয়া যায় কেবল ভবিষ্যতে। আর তারপর আবার ফিরে আসা যায় নিজের সময়ে।
এই যন্ত্র ব্যবহার করে নাৎসিরা ভবিষ্যৎ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সব বিদ্যা আয়ত্ত করে ফিরে আসে ১৯৪৪ সালে। সেই সাথে জার্মানদের যুদ্ধের চালে কোথায় কী ভুল হয়েছিল, তাও জেনে ফেলে তারা। এক পর্যায়ে স্তেফান বুঝতে পারেন, নাৎসিদের পরিকল্পনা সফল হলে গোটা বিশ্ব একটা বিরাট কারাগারে পরিণত হবে।
তাই দুঃসাহসী এক পরিকল্পনা আঁটেন তিনি। টাইম মেশিন ব্যবহার করে চলে যান অদূর ভবিষ্যতের এডলফ হিটলারের কাছে। হিটলারকে তিনি বলেন, যারা ভবিষ্যৎ থেকে ফিরে এসে বলছে হিটলার যুদ্ধের ময়দানে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা মিথ্যা বলছে। কারণ হিটলার ভুল করতে পারেন না।
মেগালোম্যানিয়াক হিটলারের মনে হয় স্তেফানের কথাই ঠিক। তিনি কি করে ভুল করতে পারেন! তাই ভবিষ্যৎ থেকে নিয়ে আসা সব জ্ঞানই আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলেন হিটলার। এগিয়ে চলেন পরাজয় আর আত্মহত্যার দিকে।
‘লাইটনিং’-এর গল্পটা কাল্পনিক হলেও হিটলারের মেগালোম্যানিয়া কাল্পনিক নয়। তার মৃত্যু পরবর্তী কিছু গবেষণায় এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেকে মহান ভাবেন, ভাবেন ভুলের ঊর্ধ্বে। ক্ষমতা তাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। অন্যের ওপর কল্পনাতীত নৃশংসতার কারণ হয়েও তারা থাকেন অবিচল।
এই রোগটির বৈশিষ্ট্য ঘেঁটে দেখতে থাকলে শেখ হাসিনার কথা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ২০২৪-এর জুলই-আগস্ট জুড়ে যে নৃশংসতার পুরোভাগে তিনি ছিলেন, তা মনে পড়লে একটা প্রশ্নই সামনে আসে, মানসিকভাবে সুস্থ কোনো ব্যক্তির পক্ষে কি এমনটা করা সম্ভব?
১৯৭৫-এ ছোট বোন রেহানাকে ছাড়া পরিবারের আর সব সদস্যকে হারিয়েছিলেন তিনি। যে হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী তিনি হয়েছিলেন, তার মানসিক অভিঘাত সীমাহীন। প্রশ্ন জাগে, এরপর কি তিনি কখনো কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তেমন কোনো দৃষ্টান্ত সামনে আসেনি এখন পর্যন্ত।
প্রশ্ন জাগে, যদি শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিংবা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর সেই আঘাতগুলো সামলে উঠতে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেন, তবে কি এমন নৃশংস স্বৈরশাসক তিনি হয়ে উঠতেন?
আরও পড়ুন
দেড় দশকেরও বেশি সময় পর জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে। নব-বসন্তে নতুন নেতা পেতে চলেছি আমরা। দেড় বছরের এত দৌড়-ঝাঁপের উদ্দেশ্য ছিল একটাই। শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট যাতে আর দেশে তৈরি না হয়। সেজন্য সংবিধান থেকে পুলিশ, সবকিছু পরিবর্তনের জন্য অন্তহীন আয়োজন। কিন্তু মানুষের মন না বদলালে দেশ বদলাবে কী করে?
সেদিন ‘সমকাল’-এ একটা প্রতিবেদন পড়ে চমকে উঠেছিলাম। দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। শুধু ২০২৩ সালেই আত্মঘাতী হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। তুলনা করতে গেলে সেই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১,৭০৫ জনের। সেই ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত করোনা মহামারিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯,৫৩১ জন। আর কেবল ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন নিদেনপক্ষে ৪৭,৯১৬ জন।
কিন্তু করোনা মহামারি কিংবা ডেঙ্গু নিয়ে যত আওয়াজ শোনা যায়, এই অর্ধলক্ষ প্রাণ নিয়ে তার তুলনায় কোনো আলোচনাই নেই। ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হলো এই সেদিন। পাশেই ছিল তাদের ৯ মাসের সন্তান সেজাদের নিথর দেহ। সাদ্দামের প্যারোল না পাওয়া নিয়ে তোলপাড় হলো বিস্তর। কিন্তু তার স্ত্রীর আত্মহত্যা নিয়ে কোনো আলাপই কানে এলো না।
এই ঘটনার তিনদিনের মাথায় ৩৫ বছর বয়সী হাফেজা খাতুন তার ৭ এবং ৫ বছর বয়সী দুই সন্তানের হাত ধরে গাজীপুরের রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে রইলেন স্থির। ছুটে আসা ট্রেন নিমেষে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিলো, মহাকালে বিলীন হলেন তারা। দৈনিক গড় ৪১ জনের তিনজন হয়ে গেলেন, কেবলই একটা সংখ্যা যেন। আলোচনার এখানেই সমাপ্তি।
এত আলোচনার উদ্দেশ্য একাটাই—মানুষ ‘খুশিতে ঠেলায়’ আত্মহত্যা করে না। আত্মহত্যার প্রবণতা মানসিক রোগের উপসর্গ মাত্র। মূল রোগ যতদিন না পর্যন্ত চিহ্নিত করা হচ্ছে, ততদিন উপসর্গ থেকে মুক্তি নেই।
সেই সাথে কেবল আইন করেই একজন নেতার স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা ঠেকানো সম্ভব নয়। সে জন্য প্রয়োজন রোগমুক্তি। কেবল শারীরিক নয়, মানসিক রোগও যে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়েরই জন্য, তার প্রমাণ এক দিকে হিটলার আর অন্য দিকে হাসিনা।
তাই বহু প্রত্যাশার এ নির্বাচনের পর আমি চাই নতুন নেতা নিজের এবং সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগী হোন। শেখ হাসিনার শাসন আমল এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গভীর মানসিক আঘাত রেখে গেছে, যা শারীরিক ক্ষতির চেয়ে কোনো অংশ কম নয়।
শারীরিক আঘাত চোখে দেখা যায়, তাই সে রোগ নির্ণয় এবং নিরাময় অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু মানসিক রোগের অদৃশ্য ক্ষত প্রাণঘাতী হওয়ার আগে পর্যন্ত কমই দৃশ্যমান হয়। কেবল জুলাই-আগস্ট মাসেই আমরা যে অপার নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছি, তার আঘাত সামলে উঠতেই এ সমাজের আরও বহু বছর লাগবে। কিন্তু সামলে ওঠার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এই ক্ষতের অস্তিত্ব স্বীকার করা।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাস্তব জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত যে ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, নির্বাচনের পর যেন তা অপসৃত হয়।
সর্বব্যাপী ঘৃণা আমাদের নাজুক সমাজকে আরও অস্থির করে তুলছে। দিন শেষে এতে কারও মঙ্গল নেই, আছে কেবল নিরন্তর অস্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি।
মানজুর-আল-মতিন : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট