ডিজিটাল ভিড়ে দায়বদ্ধতার বাতিঘর : ঢাকা পোস্ট ও পাঠকের প্রত্যাশা

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। ভোরের আলো ফোটার আগেই মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে নীলচে আলো জ্বলে ওঠে। চা নিয়ে বসার আগেই কেউ স্ক্রল করছে শিরোনাম, কেউ খুঁজছে সর্বশেষ আপডেট। কেউ আবার যাচাই করছে খবরটা আদৌ সত্য কি না।
একসময় এই দৃশ্যের কেন্দ্র ছিল কাগজের পাতা। আজ সেটা হয়েছে মুঠোফোনের স্ক্রিন। কিন্তু প্রশ্নটা সেই পুরোনোই রয়ে গেছে—খবর কি আমরা দায়িত্ব নিয়ে বলছি?
এই প্রশ্নটাই আমাদের টেনে নিয়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯১২ সালের সেই বিখ্যাত আক্ষেপের দিকে। ইংল্যান্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে সংবাদপত্রের দায়িত্ববোধ ও পাঠক-লেখক সম্পর্ক নিয়ে তার ‘পথের সঞ্চয়’-এ লিখেছিলেন, এ দেশে লেখকের কাছে আমরা দায়িত্ব চাই না বলেই লেখকও দায়িত্ব নেন না; সম্পাদকও সতর্ক হন না; পাঠকও নির্বিচারে পড়ে যান।
একশো বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। মাধ্যম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই তিরস্কার কি আজও আমাদের কানে বাজে না?
এই প্রশ্ন নিয়েই বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমের অন্যতম জনপ্রিয় নাম ঢাকা পোস্ট-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। এই সংবাদমাধ্যমটি পাঠকের কাছে কী, আর পাঠকের কাছে এর দায় কতখানি?
অনলাইন সংবাদমাধ্যমের উত্থান বাংলাদেশে খুব পুরোনো নয়। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এই তিনের যুগলবন্দিতে খবর আজ হাতের মুঠোয়। কিন্তু হাতের মুঠোয় আসা মানেই কি হৃদয়ের ভেতর জায়গা পাওয়া? বিশ্বাসযোগ্যতা কি শুধু গতির সঙ্গে আসে?
ঢাকা পোস্ট এই প্রশ্নের ভেতর দিয়েই নিজের যাত্রা শুরু করেছিল। জন্মলগ্ন থেকেই এটি নিজেকে শুধু ‘দ্রুত’ নয়, ‘দায়িত্বশীল’ সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। পাঠক সংখ্যার নিরিখে আজ এটি দেশের শীর্ষ অনলাইন দৈনিকগুলোর একটি। এটা নিছক পরিসংখ্যান নয়, এটা পাঠকের আস্থা। কিন্তু পাঠকের চাহিদা কী? শুধু ব্রেকিং নিউজ? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?
এখানে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, পত্রিকার ঘাটতির দায় শুধু সম্পাদক বা লেখকের নয়, এর শিকড় সমাজের মনোবৃত্তিতে। সমাজ যদি বিভক্ত হয়, চিন্তায় যদি অসাড়তা আসে, তবে সম্পাদকও বুঝতে পারেন না—কার হয়ে, কার কাছে কথা বলবেন।
বাংলাদেশের সমাজও কি আজ সেই সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে না? প্রশ্ন করার জায়গা কিন্তু থেকেই যায়। রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক উত্তেজনা, ভুয়া খবরের স্রোত—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছি আমরা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘাঁটলে সেই তথ্যই চোখ ছানাবড়া করে। এই সময়ে ঢাকা পোস্ট-এর মতো একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল খবর দেওয়া নয় বরং খবরের ভেতর দিয়ে সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানোর কাজটিও করে যাচ্ছে নিভৃতে।
পাঠক আজ আর নিষ্পাপ নন। তারা জানেন খবর কীভাবে বানানো যায়! কীভাবে গিলানো হয়! শিরোনাম দিয়ে মনোযোগ কাড়া যায়। আবেগ উসকে দেওয়া যায়। অযথা সুড়সুড়ি দিয়ে রগরগে করা যায় ঠিক। কিন্তু সংবাদ তৈরির মাপকাঠি বলে কথা আছে। সেটা কি করা সম্ভব?
এটা ঠিক মানুষের এখন চাহিদা অনেক বদলেছে। তারা জানতে চান ঘটনার ভেতরের খবর। খুব গভীরে ঢুকে তারা সঠিক সত্য উন্মোচন করতে চায়। জানতে চায় খবরের উৎস কী? সংবাদ বিশ্লেষণের পেছনে কোনো যুক্তি কাজ করছে কিনা? সেটাও পরখ করে চায়।
আবার ভাবাতেও চায় সংবাদ তৈরি কি শুধু উত্তেজনা সৃষ্টি করতে নাকি? এই দিক থেকে কিন্তু ঢাকা পোস্টকে আলাদা করতেই হয়। তারা সাবলীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ধারাটি ঠিকভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন
এই বিষয়ে একজন পাঠকের কথা মনে পড়ে গেল। একটি পাঠকসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের মত আমার মতের সঙ্গে মিলতে নাও পারে কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে বলুন। সমাজের প্রতি আপনাদের দায় আছে।’
এই বাক্যটি অনলাইন যুগে আরও তীক্ষ্ণ। কারণ এখন ভুল তথ্যের ক্ষতি বহুগুণ বেশি। একটি ভুয়া খবর কয়েক মিনিটে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। দায়িত্বহীনতা তাই আর কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে আসে।
ঢাকা পোস্ট-এর পাঠকরা এই দায়টাই মনে করিয়ে দেন বলে আমি প্রত্যাশা করি। সেটা হতে পারে কখনো প্রশংসায় বা কখনো সমালোচনার ছলে। ডিজিটাল যুগে সংবাদ উপস্থাপন করার কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে পাঠকের কাছে অতি সহজে সংবাদ পৌঁছানো সম্ভব। সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সে, ইনবক্সে, পাঠক প্রতিক্রিয়ায়—এই সংলাপ দেখলে অতি সহজে বোঝা যায় কেমন হচ্ছে নিজের কাজ। এটাই অনলাইন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও।
বৈশ্বিক গণমাধ্যম প্রেক্ষাপটও আমাদের সতর্ক করে। সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম আজ সর্বত্র চাপে। কোথাও রাষ্ট্রীয় দমন, কোথাও কর্পোরেট স্বার্থ, কোথাও বিজ্ঞাপনের ভয়। ফিলিপাইন, তুরস্ক, রাশিয়া, মিয়ানমারসহ বহুদেশের সংবাদ স্বাধীনতার গল্পগুলো আমাদের অজানা নয়। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা পোস্ট-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল উৎসবের দিন নয় বরং আত্মসমালোচনার দিনও। প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি সত্যিই নির্ভীক? আমরা কি তথ্যনির্ভর? আমরা কি পাঠকের বুদ্ধিকে সম্মান করি? কারণ সাংবাদিকতার ইতিহাস আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে।
কলম কখনো শুধু কলম থাকে না। কলম হয়ে ওঠে লেখনীর বড় অস্ত্র। যেখানে প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে সত্য তথ্য তুলে ধরতে হয়।
আবার তাদের ভুলগুলোও তুলে ধরতে হয়। ইতিহাস বলছে, ফরাসি সাংবাদিক এমিল জোলা (১৮৪০-১৯০২) একা একটি রাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন শুধু লেখনীর মাধ্যমে। গান্ধীর লেখালেখি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়েছিল। সাংবাদিকতার শক্তি এখানেই। সে রাষ্ট্রের মুখপাত্র নয়, নাগরিকের বিবেক। অবলার একমাত্র অবলম্বন বা কারও শেষ রক্ষাকবচ।
অনলাইন মাধ্যমে পাঠকের চাহিদা এখন দ্রুত বদলায়। আজ তিনি ভিডিও চান, কাল ইনফোগ্রাফিক, পরশু বিশ্লেষণ। কিন্তু এই সবকিছুর নিচে একটি মৌলিক চাহিদা অটুট সেটা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। ঢাকা পোস্ট যদি এই বিশ্বাস ধরে রাখতে পারে, তবে পাঠকসংখ্যা শুধু সংখ্যা হয়ে থাকবে না বরং হয়ে উঠবে সামাজিক শক্তি। পাঠক তখন শুধু খবর পড়বেন না, আলোচনায় অংশ নেবেন, প্রশ্ন তুলবেন, মতভেদ করবেন। পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন। এটাই সুস্থ গণমাধ্যমের লক্ষণ।
ফিরি আবার রবীন্দ্রনাথের কাছে, বেঁচে থাকলে হয়তো আজও তিনি তিরস্কার করতেন। কিন্তু হয়তো এটাও বলতেন যে, যদি কোথাও দায়িত্ববোধের চর্চা থাকে, যদি কোথাও সম্পাদকীয় সাহস থাকে, যদি কোথাও পাঠককে নির্বোধ ভাবা না হয়, তবে সেখানেই আশার আলো।
ঢাকা পোস্ট-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেই আশাটুকুই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ডিজিটাল ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে যদি ঢাকা পোস্ট নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—তারা কতটা দায়িত্বশীল? তবেই তারা আলাদা। পাঠক সমাজের কাছে বাড়বে তাদের গুরুত্ব।
সস্তা জনপ্রিয়তার মতো ভৌ-দৌড় না দিয়ে বরং নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করতে হবে। শুধু শিকারির মতো ভিউ ব্যবসা কিংবা ছোবল মারলে হবে না। সংবাদের নীতি-নৈতিকতা, আপেক্ষিকতা, গঠন, বস্তুনিষ্ঠতা, সুস্পষ্টতা, প্রাগঢ়তার ও নিরপেক্ষতার ওপর নজর দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেই। তাদের নীতি, অনুশীলন আর সততা। আর সবচেয়ে বড় ভরসা হলো সচেতন পাঠক। এই পথ চলা দীর্ঘ হোক, প্রশ্নে-সমালোচনায়-সংলাপে সমৃদ্ধ হোক। এই কামনাই থাকুক ঢাকা পোস্ট-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে।
প্রশান্ত কুমার শীল : শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]