অন্ধকার থেকে আলোর পথে, প্রয়োজন বাস্তবিক সিদ্ধান্ত

ঢাকার এক ব্যস্ত মহল্লায় বাস করে রাশেদ নামের সাধারণ চাকরিজীবী। প্রতিদিন ভোরে বের হন, রাতে ফেরেন। কয়েক মাস ধরে তার এলাকায় মোবাইল ছিনতাই, মোটরসাইকেল চুরি, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েছে। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রাশেদ নিজেই ছিনতাইয়ের শিকার হন। থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে দ্বিধা, কারণ তিনি শুনেছেন—মামলা নিলেও ফল পাওয়া কঠিন। তবু তিনি অভিযোগ করেন। কয়েক সপ্তাহ কেটে যায়, কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
রাশেদের এই গল্প একক নয়; এটি নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে জনমনের উদ্বেগের প্রতীক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তাবোধ, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা এবং বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নগর এলাকায় ছিনতাই, সাইবার প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং কিশোর অপরাধের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার দ্রুত প্রচার মানুষের ভয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য—জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য আইনশৃঙ্খলার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি কেবল পুলিশি নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে নানা পথ অনুসরণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে এল সালভাদর-এর কথা উল্লেখ করা যায়। সেখানে গ্যাং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অভিযান চালিয়ে ব্যাপক গ্রেপ্তার নীতি গ্রহণ করে। অপরাধের হার দ্রুত কমলেও মানবাধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে। শিক্ষা হলো—কঠোরতা ফল দিতে পারে, তবে আইনের শাসন ও মানবিক নীতি উপেক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয় না।
অন্যদিকে ব্রাজিল-এর কিছু শহরে কমিউনিটি পুলিশিং ও তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় সামাজিক কর্মসূচি চালু করা হয়। এতে অপরাধ কমার পাশাপাশি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC) আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়—তথ্যভিত্তিক নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকারসম্মত পুলিশিং। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগই অপরাধ হ্রাসে স্থায়ী ফল দেয়।
এমন বাস্তবতায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহ থেকেই কয়েকটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
১. দৃশ্যমান নিরাপত্তা বার্তা: সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছ ও নিয়মিত ব্রিফিং চালু করা প্রয়োজন।
২. অপরাধ মানচিত্র প্রকাশ: দেশব্যাপী অপরাধের পরিসংখ্যান উন্মুক্ত করে ‘ক্রাইম ম্যাপিং’ চালু করা হলে মানুষ যেমন সচেতন হবে, তেমনি পুলিশও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
৩. দ্রুত প্রতিক্রিয়া টাস্কফোর্স: ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা দরকার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার—সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব—অপরিহার্য।
৪. থানাকে জনবান্ধব করা: মামলা গ্রহণে অনীহা বা হয়রানি বন্ধে কঠোর নজরদারি ও অভিযোগ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন জরুরি। অনলাইনে এফআইআর গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারেও প্রয়োজন বেশকিছু জরুরি উন্নয়ন কর্মসূচি।
পুলিশ বাহিনীর উন্নয়ন:
- প্রশিক্ষণে মানবাধিকার, সাইবার অপরাধ ও আধুনিক তদন্ত পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা।
- কর্মঘণ্টা ও বাসস্থানের উন্নতি; কারণ ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত বাহিনী কার্যকর হতে পারে না।
- অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ইউনিট শক্তিশালী করা।
- কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার:
প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করে স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা। জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সামাজিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
কিশোর অপরাধ রোধে স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, খেলাধুলা ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো অপরাধ কমাতে সহায়ক।
বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা:
মামলার জট কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। বিচার বিলম্ব হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায়।
মানবিক নিরাপত্তার ধারণা:
আইনশৃঙ্খলা মানে শুধু অপরাধ দমন নয়; এটি মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ নাগরিক যেন ভয়ের মধ্যে না থাকে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় থাকে এবং সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠী সুরক্ষিত থাকে। কঠোর ও মানবিকতা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই টেকসই পথ।
শুরুতে যার কথা বলছিলাম, গল্পের সেই রাশেদ যদি একদিন দেখেন—তার এলাকায় পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে, অভিযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিশোররা খেলাধুলায় ব্যস্ত—তবে তিনি বুঝবেন পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন একদিনের কাজ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নতুন সরকারের প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট বার্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, মানবাধিকার সম্মত কঠোরতা এবং সামাজিক বিনিয়োগ—এই চার ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেই পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব।
নিরাপদ বাংলাদেশ মানে কেবল অপরাধ কমা নয়; বরং নাগরিকের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনা। আর সেই লক্ষ্যেই রাষ্ট্র, পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টাই হতে পারে অন্ধকার গলি থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায়।
এম এম বাদশাহ্ : প্রধান বার্তা সম্পাদক, বাংলা টিভি
[email protected]