বিজ্ঞাপন

তামাক চোরাচালান : ভয়ের আড়ালে প্রকৃত সত্য, প্রয়োজন কার্যকর সমাধান

অ+
অ-
তামাক চোরাচালান : ভয়ের আড়ালে প্রকৃত সত্য, প্রয়োজন কার্যকর সমাধান

তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সরকার যখনই কর বৃদ্ধি বা আইন শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তখনই তামাক কোম্পানিগুলো ‘চোরাচালান বৃদ্ধি ও রাজস্ব ক্ষতির জুজু’ হাজির করে। এই খোঁড়া যুক্তিটি গণমাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত প্রচারের ফলে নীতিনির্ধারণী মহলে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে বিলম্বিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আশঙ্কা আদৌও কতটা বাস্তবসম্মত, নাকি তামাক কোম্পানি কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি ভয়?

বিজ্ঞাপন

একাধিক গবেষণালব্ধ তথ্য বলছে, বাংলাদেশে তামাক চোরাচালান একটি সমস্যা হলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত সিগারেটের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ অবৈধ উৎস থেকে আসে। ২০২৫ সালে ‘অবৈধ সিগারেট বিক্রির পরিমাণ, কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ নিয়ে করা একটি গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে অবৈধ সিগারেটের পরিমাণ ৫.৬ শতাংশ।

সম্প্রতি ইনসাইট মেট্রিক্সের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশে অবৈধ তামাক ব্যবসার বিস্তার প্রায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে! যা নিতান্তই ভিত্তিহীন। মূলত নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার জন্যই এই অপপ্রচার তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পাশাপাশি চলমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা এবং আসন্ন জাতীয় বাজেটে তামাকের ওপর সম্ভাব্য কর বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্যই এমন অপপ্রচার। অর্থাৎ, সমস্যাটি বাংলাদেশে যে নেই তা নয় কিন্তু সেটি তামাক কোম্পানিগুলোর প্রচারিত ভয়াবহ মাত্রায় নয়। বরং এখানে বাস্তবতার চেয়ে সমস্যাকে বড় করে তুলে ধরার প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান।

কর বৃদ্ধি নয়, দুর্বল ব্যবস্থাপনাই মূল সমস্যা

বিজ্ঞাপন

চোরাচালান বৃদ্ধির জন্য প্রায়শই কর বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা International Centre for Tax and Development-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে চোরাচালানের সাথে কর বৃদ্ধির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং দুর্বল কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, সীমিত নজরদারি, লাইসেন্সিংয়ের অভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিই চোরাচালানের প্রধান কারণ।

বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন পর্যায়ে কার্যকর ট্র্যাকিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। এর ফলে উক্ত তামাকজাত দ্রব্য কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে বাজারে এসেছে এবং যথাযথ কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং স্বার্থান্বেষী মহল অবৈধ তামাকজাত দ্রব্য বাজারজাত করে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি দুইই বাড়ায়। ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এই খাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্সই নেই। ফলে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যের বাজারের একটি বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত ও অদৃশ্য অর্থনীতির মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অপপ্রচারের পেছনে কার স্বার্থ?

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা শক্তিশালীকরণের বিরুদ্ধে ‘চোরাচালান বাড়বে’ যুক্তিটির ব্যবহার নতুন নয়। তামাক কোম্পানি প্রায়ই এই যুক্তিকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে সরকার কর বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্যোগ বিলম্বিত হয় এবং তামাক কোম্পানিগুলো তাদের বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

বাস্তবে দেখা গেছে, যেসব দেশ কর বৃদ্ধি এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ উভয়কেই একসঙ্গে শক্তিশালী করেছে, সেসব দেশে চোরাচালান কমেছে এবং সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। ব্রাজিল, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ এই ক্ষেত্রে সফল উদাহরণ। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট-উল্লিখিত সমস্যা সমাধানের মূল উপায় হলো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করা।

আন্তর্জাতিক সমাধান: সরবরাহ চেইনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অধীনে ‘Protocol to Eliminate Illicit Trade in Tobacco Products (ITP)’ ব্যবস্থা গ্রহণ তামাকজাত দ্রব্য চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই প্রোটোকল তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা প্রস্তাব করে। এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং।

এই প্রোটোকল অনুযায়ী প্রতিটি তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে একটি ইউনিক কোড থাকবে, যার মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা যাবে পণ্যটির উৎপত্তি, পরিবহন এবং বিক্রয়ের তথ্য। এর ফলে কর ফাঁকি এবং তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অবৈধ উৎপাদন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এই প্রোটোকলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উল্লেখ্য, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নীতির সফলতা বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৫৪টি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে এবং ৭১টি পক্ষ এই চুক্তিটি অনুমোদন করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণ এবং তামাকজনিত রোগের কারণে ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তামাকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এর অবৈধ সরবরাহও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। এই অতিরিক্ত রাজস্ব স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অবৈধ তামাকজাত দ্রব্য সাধারণত সস্তা হওয়ায় ভোক্তাদের কাছে এটি সহজলভ্য হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তামাক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

দেশের বিদ্যমান আইনই হতে পারে সমাধান

বাংলাদেশের জন্য আশার কথা হলো, তামাক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ বিষয়াবলি ইতিমধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন এবং রাষ্ট্রের বিদ্যমান বিভিন্ন আইন কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা (৮.১), কোম্পানি আইন ১৯৯৪ (সংশোধিত ২০২০) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ এর ধারা ৫৮ (৩- ক), ৫৯ এ তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদক ও বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং গ্রহণ, শাস্তি এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ, চোরাচালান নীতি গ্রহণের জন্য নতুন আইন তৈরির প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান আইনকে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যুক্ত করলেই একটি শক্তিশালী ও স্থায়িত্বশীল তামাক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তামাক চোরাচালান সহনীয় পর্যায়ে আছে। এই অবস্থাতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এটি দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। সুতরাং চোরাচালানের বর্তমান চিত্র কোনোভাবেই তামাক নিয়ন্ত্রণের পথে অজুহাত হতে পারে না বরং এটি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তারা কি অপপ্রচার ও আশঙ্কার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন, নাকি প্রমাণ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন?

একটি শক্তিশালী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ একই সঙ্গে চোরাচালান কমাতে, রাজস্ব বাড়াতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের নীতিও।

তাই এখনই প্রয়োজন তামাকজাত দ্রব্য চোরাচালান নীতি গ্রহণের মতো একটি সাহসী, প্রমাণভিত্তিক এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ উপহার দিতে পারে।

মিঠুন বৈদ্য : উন্নয়নকর্মী

বিজ্ঞাপন