বিজ্ঞাপন

রাম সাগরের কিংবদন্তি থেকে উপকূলীয় বাংলাদেশের সুপেয় পানির সংকট

অ+
অ-
রাম সাগরের কিংবদন্তি থেকে উপকূলীয় বাংলাদেশের সুপেয় পানির সংকট

বাংলার উত্তর প্রান্ত দিনাজপুরে আজও টিকে আছে এক বিশাল জলাধার—রাম সাগর। লোককথা বলে, রাজা রামনাথ তার প্রজাদের জন্য পানির নিশ্চয়তা দিতে এই সাগর খনন করেছিলেন। কথিত আছে, খননকাজের শেষে দীঘিতে পানি না উঠলে রাজা নিজের প্রিয় পুত্রকে বলি দিতে দ্বিধা করেননি, কারণ তার বিশ্বাস ছিল, পানি ছাড়া রাজ্য টিকে থাকতে পারে না। সত্য-মিথ্যার সীমারেখা যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রাচীন বাংলার রাজ-রাজারা, জমিদাররা জানতেন, পানি জীবন, পানিই সভ্যতার ভিত্তি।

বিজ্ঞাপন

একই ইতিহাসের ধারায় আমরা দেখি আঠারো শতকের বাংলায় নাটোরের মহারাণী ভবানীর কথা। দুর্ভিক্ষ, খরা ও পানির সংকট মোকাবিলায় তিনি রাজস্ব ব্যয় করে একের পর এক পুকুর ও দিঘি খনন করেছিলেন, রাণী ভবানীর দীঘি আজও তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রজাদের পানির অধিকার ও কৃষিকাজের সুবিধাই ছিল তার এসব উদ্যোগের মূল প্রেরণা। শাসক বা জমিদার যেই হোন না কেন, পানির নিরাপত্তাকে তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখেছেন।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যায়, বাংলার প্রায় প্রতিটি প্রাচীন জনপদেই রাজা, জমিদার কিংবা সমাজ নেতারা পুকুর, দিঘি ও খাল খনন করেছেন। এগুলো শুধু পান করার জল নয়, কৃষি, জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ছিল অপরিহার্য।

অতীত থেকে বর্তমান: জল ব্যবস্থাপনায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

বিজ্ঞাপন

হাজার বছর পর, আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে বিপুল পানি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তার নিরাপত্তা নেই। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও বাস্তবতা হলো, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় বেল্টে, বিশুদ্ধ পানির অভাব এখন নিত্যদিনের সংকট।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, লবণাক্ততা ঢুকে পড়ছে ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষিজমিতে, আর্সেনিক দূষণ, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মিঠা পানির উৎস ধ্বংস করছে, বৃষ্টির ধরন অনিয়মিত হয়ে উঠছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নদী দূষণ, খাল দখল, জলাশয় ভরাট যা পানির প্রবাহকে মারাত্মক ভাবে বাধাগ্রস্থ করেছে।

ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, লক্ষ্মীপুরসহ উপকূলীয় এলাকায় লাখো মানুষ পানযোগ্য পানির তীব্র সংকটে পড়ছে। নারীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে জল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, শিশুরা পড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে, কৃষি উৎপাদন কমছে, এবং দারিদ্র্য আরও গভীর হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক জলসংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

জাতিসংঘের ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ (UNU‑INWEH) প্রকাশিত জানুয়ারি ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাংকরাপ্সি (Global Water Bankruptcy)’ প্রতিবেদন, উপকূলীয় বাংলাদেশ ও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা বহন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে মিঠা পানির অতিরিক্ত উত্তোলন ইতোমধ্যে টেকসই সীমা অতিক্রম করেছে।

এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে, যার মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় বেল্ট অন্যতম। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রধান ভূগর্ভস্থ জলাধারের প্রায় ৭০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ের মুখে, অর্ধেকের বেশি বড় হ্রদ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রায় ৪১০ মিলিয়ন হেক্টর প্রাকৃতিক জলাভূমি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত। দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলে এর অর্থ হলো, পানযোগ্য জলের উৎস কমে যাওয়া, কৃষিতে লবণাক্ততার বিস্তার এবং জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খরার কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৩০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ বহন করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। একই সঙ্গে, বিশ্বে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত এবং ৩৪ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা পায় না, যার প্রভাব বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর আরও গভীর ও বৈষম্যমূলকভাবে পড়ছে। বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নয়। বরং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে আমরা এর প্রথম সারির ভুক্তভোগী।

এই বৈশ্বিক সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দা রওশন আরা প্রতিদিন ভোরে হাঁটা শুরু করেন, চার কিলোমিটার দূরের একটি মাত্র কার্যকর টিউবওয়েলের জন্য। লবণাক্ত পানিতে ভরা পুকুর আর নোনা ভূগর্ভস্থ জল তার পরিবারের জন্য আর ব্যবহারযোগ্য নয়। খুলনার কয়রায় একসময়ের কৃষক আজ লবণাক্ত জমিতে ফসল ফলাতে না পেরে জীবিকা বদলাতে বাধ্য, আর ভোলার চরাঞ্চলে অনেক পরিবার বিশুদ্ধ পানির অভাবে বর্ষার পানিই ভরসা করে।

এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে উপকূলীয় বাংলাদেশে জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত, জলবায়ু-সহনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি জল ব্যবস্থাপনাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

নীতি আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়?

বাংলাদেশ সরকারের জলসম্পদ নীতি, উপকূল উন্নয়ন পরিকল্পনা, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ সবই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্থানীয় পর্যায়ে এই নীতিগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর? পানির উৎস সংরক্ষণ, পুনঃব্যবহার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ কি যথেষ্ট? শুধু WASH (পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন) নয়, জলবায়ু সহনশীল জল ব্যবস্থাপনা কি নীতির কেন্দ্রে এসেছে?

বাস্তবতা হলো, অনেক উদ্যোগ এখনো প্রকল্পভিত্তিক, খণ্ডিত এবং স্বল্পমেয়াদি। উপকূলীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বিনিয়োগবান্ধব জল ব্যবস্থাপনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে আনতে শুরু করেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর থেকে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কৃষি, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জলনিরাপত্তায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প একটি সম্ভাব্য যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারা বছর মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত হতে পারে, যা কোটি মানুষের কৃষি, পানীয় জল, মৎস্য, নৌপরিবহন ও জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। পদ্মা ব্যারাজ শুধু খরা ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় সহায়ক হবে না, বরং নদীভিত্তিক টেকসই জল ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকনির্দেশনা দেবে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, জলসংকট মোকাবিলায় শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত পরিকল্পনা থাকলে জাতীয় থেকে স্থানীয়, সব পর্যায়ে টেকসই সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব।

বিনিয়োগের সংকট: জল লাভজনক নয়, কিন্তু অপরিহার্য

বিশ্বব্যাপী জলখাতে বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে পিছিয়ে। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজন প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে অধিকাংশ অর্থই আসে সরকারি খাত থেকে। বেসরকারি বিনিয়োগ মাত্র কয়েক শতাংশ। বাংলাদেশেও একই চিত্র। অথচ নিরাপদ পানি ছাড়া স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না, খাদ্য উৎপাদন টেকসই হয় না, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সামনে পথচলা: রাম সাগরের শিক্ষা নতুন করে ভাবা দরকার

রাম সাগরের কিংবদন্তি আমাদের শেখায়, জল ব্যবস্থাপনা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব। আজ আমাদের দরকার—

উপকূলভিত্তিক জল ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তা;

লবণাক্ততা মোকাবিলায় উদ্ভাবনী সমাধান;

স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়;

তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থাপনা;

পানিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনা;

প্রাচীন রাজা আর জমিদাররা যদি সীমিত প্রযুক্তি নিয়েও ভবিষ্যৎ ভেবে জলাধার খনন করতে পারেন, তবে আধুনিক বাংলাদেশ কেন পারবে না? জলই জীবন, এই সত্যকে নীতিতে, বিনিয়োগে এবং বাস্তব কাজে রূপ দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

সাগর মারান্ডি : ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন