ঢাকা ১৮ : শেষ সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঝড়

ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচনী রাজনীতি শেষ মুহূর্তে এসে নাটকীয় মোড় নিয়েছে। শুরু থেকেই ব্যাপক প্রচারণা চললেও শেষ দিনে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহারের ফলে ভোটের মাঠে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রার্থীদের এই ধারাবাহিক সরে দাঁড়ানোর কারণে আগের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিরচেনা চিত্রে ব্যাপক বদল ঘটেছে।
তবে, প্রার্থীর সংখ্যা কমলেও নির্বাচনী উত্তাপ একটুও কমেনি। নতুন এই সমীকরণে ঢাকা-১৮ আসনের ভোট এখন কার্যত ‘বিএনপি বনাম ১০ দলীয় জোট’-এর দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশলই এখন নির্ধারণ করবে এই আসনের ভোটের চূড়ান্ত গতিপথ।
মূলত, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উত্তরা, তুরাগ, খিলক্ষেত, উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৮ আসনটি ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত দিক থেকে রাজধানীর অন্যতম বৃহত্তম নির্বাচনী এলাকা। এই আসনের একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও উত্তরা মডেল টাউনের মতো পরিকল্পিত আধুনিক আবাসিক অঞ্চল রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে উত্তরখান ও দক্ষিণখানের মতো দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষাকৃত অবহেলিত ও জনবহুল এলাকা।
সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ নব্বই হাজার। ভোটারদের বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পেশাজীবী হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক আবেগের চেয়ে নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্ন বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যেকোনো নির্বাচনে এই আসনটি বরাবরই দলগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনী আলোচনার শুরুতেই জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে ঢাকা-১৮ আসনে বেশ চাঞ্চল্য তৈরি হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রথম সারির নেতা হিসেবে পরিচিত পাটওয়ারীকে এই আসনে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হলে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়।
তবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনে এই পরিকল্পনায় ছেদ পড়ে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। এ অবস্থায় জাতীয় নাগরিক কমিটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে পাটওয়ারীকে ঢাকা-১৮ আসন থেকে সরিয়ে ঢাকা-৮ আসনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সরে যাওয়ার পর ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির (জাতীয় নাগরিক কমিটি) কাণ্ডারি হিসেবে সামনে আসেন দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। সংগঠনের ভেতরে দক্ষ মাঠপর্যায়ের সংগঠক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি তুলনামূলক কম। তবে, প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকে তিনি পুরোদমে গণসংযোগ শুরু করেন। উত্তরা, খিলক্ষেত, তুরাগ, উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে দেখা যায় তাকে।
এনসিপির দাবি, তরুণ ভোটার এবং পরিবর্তনকামী একটি বড় অংশ আদীবের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে এই জনসমর্থনকে শেষ পর্যন্ত ব্যালটে রূপ দিতে দলের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জোট রাজনীতির জটিল সমীকরণ।
ভোটের লড়াই এখন ‘বিএনপি বনাম জোট’
এদিকে শুরু থেকে মাঠে বেশ সক্রিয় ও শক্ত অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কার্যক্রম। ঢাকা–১৮ আসনে দলটির প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ আশরাফুল হক নিয়মিত গণসংযোগ, মোটরসাইকেল শোডাউন এবং মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে থাকেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে স্থানীয়ভাবে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকায় অনেকে ধারণা করেছিলেন, জামায়াত হয়তো এই আসনে শেষ পর্যন্ত শক্ত অবস্থান নেবে। মাঠপর্যায়ে দলটির কর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল, যা ভোটের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
তবে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় একে একে কয়েকজন প্রার্থী সরে দাঁড়ান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক আসে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ আশরাফুল হকের সিদ্ধান্তে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
এর আগে ১৭ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানান, বৃহত্তর ঐক্য ও জোটের স্বার্থে ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপি (জাতীয় নাগরিক কমিটি) মনোনীত প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবকে সমর্থন দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে দেশ ও ইসলামের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি তার সমর্থকদের এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে একযোগে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী বিলকিস নাসিমা রহমান, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহম্মদ আশরাফুল হক, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী মফিজুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইফ উদ্দিন আহমদ খন্দকার এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ নেয়ামতুল্লাহ।
অন্যদিকে, এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। নির্বাচনী মাঠে তার নামার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল। বিশেষ করে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তার মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ হয়নি। এ ছাড়া বিএনপির আরও একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা এই আসনের ‘কাণ্ডারি’ হতে চেয়েছিলেন। তবে, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনই দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে ভোটের মাঠে লড়ছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতায় তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসী এবং শক্তপোক্তভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন৷ বিএনপি নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে জাহাঙ্গীর হোসেনের ব্যক্তিগত পরিচিতি ভোটের মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, ঢাকা-১৮ আসনের ভোটারদের প্রত্যাশা এবার অতীতের তুলনায় ভিন্ন। উত্তরা, খিলক্ষেত ও তুরাগ এলাকার ভোটাররা বলছেন, তারা কেবল দলীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে রায় দিতে চান না। তাদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে— আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন।
দল নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে ট্রাফিক ও নাগরিক সুবিধা
উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার ভোটারদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, নিয়মিত কর পরিশোধ করলেও তারা কাঙ্ক্ষিত নগর সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বঞ্চনাবোধ এবার ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ভোটার ও বেসরকারি চাকরিজীবী রিফাত জামান বলেন, রাতের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং যানজট নিরসনই এখানে প্রধান সমস্যা। যে প্রার্থী এসব সংকট সমাধানে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবেন, তিনিই এগিয়ে থাকবেন। আমি এমন কাউকেই বেছে নেব, যিনি সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে পারেন।
তরুণ ভোটার সাজিদ আমিন মনে করেন, গতানুগতিক ধারার ভোটিং কালচার এবার বদলে গেছে। শুধু নামজাদা প্রার্থী হলে চলবে না, কাজের সক্ষমতা থাকতে হবে। আমরা দল নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেখব। এবার প্রচারণায় ভোটারদের সচেতনতা চোখে পড়ার মতো, যার প্রতিফলন ব্যালটেও দেখা যাবে।
যানজট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকার ব্যবসায়ী ফাহাদ মুনতাসির বলেন, ১৫ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে এখন ৪৫ মিনিট সময় লাগে। রাজলক্ষ্মী, জসিমউদ্দিন ও হাউজবিল্ডিং মোড়সহ সেক্টরগুলোর ভেতরে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে যানজট এখন অসহনীয়। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতি ছাড়াও শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যিনি এই আসনের কাণ্ডারি হবেন, তাকে অবশ্যই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর রূপরেখা দিতে হবে।

এলাকাবাসীর মতে, এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত বেসরকারি হাসপাতাল থাকলেও মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত অপ্রতুল। উত্তরা ও আশপাশের এলাকার একমাত্র ভরসা ‘বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল’। তবে সেখানে শয্যা ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা থাকায় সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়।
উত্তরখান এলাকার বাসিন্দা মালিহা রহমান বলেন, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের পরিসর ও সেবার মান দ্রুত বাড়ানো জরুরি। এখানে বিশেষায়িত সেবা এবং জরুরি বিভাগকে আরও উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি উত্তরখান-দক্ষিণখান এলাকার সবচেয়ে বড় ভোগান্তি হলো অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এলাকা দুটি তুলনামূলক অনুন্নত হওয়ায় এখানকার অপরিকল্পিত সড়ক ও অকেজো ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জনভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে।
সেখানকার আরেক ভোটার মো. রাশেদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এলাকার ভেতরের রাস্তাগুলো বছরের পর বছর ধরে ভাঙাচোরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটু সমান পানি জমে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে— নির্বাচনের পর উত্তরখান-দক্ষিণখানে কোনো প্রতিনিধিকে নিয়মিত পাওয়া যায় না। এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এই উপেক্ষা ও বঞ্চনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখব।
সার্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন কার্যত দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে মোড় নিয়েছে। একদিকে রয়েছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, অন্যদিকে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব— যিনি জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কিছু সমমনা রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থন পাচ্ছেন। উভয়পক্ষ জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এবং নিজেদের অবস্থান সুসংহত বলে দাবি করছে।
তবে, মাঠপর্যায়ে ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি, কেন্দ্রভিত্তিক সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ভোটের দিনের সার্বিক পরিবেশের ওপর।
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিএনপির এস এম জাহাঙ্গীর
ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন মনে করেন, নির্বাচনী এলাকাটি আয়তনে বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিনের মাঠ-রাজনীতি তাকে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, “বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক পরিবার। এখানে মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছেন। এই এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরে আমাদের দক্ষ কর্মী বাহিনী রয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে রাজনীতি করায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ও নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। করোনাকালীন দুর্যোগ থেকে শুরু করে যেকোনো সংকটে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে জনগণের পাশে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।”

উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা এবং অনুন্নত সড়ক অবকাঠামো নিয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান ভোগান্তি হলো সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় এখানে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীনদের অবহেলায় সেই ধারা ব্যাহত হয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও উন্নত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলব।”
স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সক্রিয় থাকলেও বিএনপি কাউকে ছোট বা বড় হিসেবে দেখে না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা একটি ‘মানবিক রাষ্ট্র’ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। ইনশাআল্লাহ বিএনপি সরকার গঠন করলে এখানে কোনো রাজনৈতিক বৈষম্য, নির্যাতন বা নিপীড়নের অবকাশ থাকবে না। আমরা ঢাকা-১৮ আসনের মানুষকে শান্তিতে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ নেব।

ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশ-ইসলামের স্বার্থ বড় : আসন ছাড় দেওয়া জামায়াত নেতা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আশরাফুল হক।
এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-১৮ আসনের প্রতিটি অলিগলি এবং মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছি। আপনাদের (ভোটারদের) চোখে যে প্রত্যাশার আলো দেখেছি, সেটাই আমার আগামীর পথচলার পাথেয়। তবে সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী— বৃহত্তর ঐক্য ও জোটের স্বার্থে আমি নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছি এবং এই আসনটি আমাদের জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবকে ছেড়ে দিচ্ছি।
আশরাফুল হক আরও যোগ করেন, আমার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থ রক্ষা আমার কাছে অনেক বড়। যেকোনো বড় বিজয় অর্জনের জন্য এই মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ থাকা অপরিহার্য। তাই আমি সব কর্মী-সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
উত্তরাকে বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই : আদীব
ঢাকা-১৮ আসনের পরিবর্তিত নির্বাচনী প্রেক্ষাপটকে জোটগত ঐক্য এবং বাস্তব রাজনৈতিক বিবেচনার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন ১০ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী ও এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
তিনি বলেন, একদিনে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার প্রমাণ করে— এই নির্বাচনে ব্যক্তিগত হিসাব নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রার্থী সংখ্যা কমে এলেও ভোটের উত্তাপ কমেনি; বরং ভোটারদের সামনে এখন একটি স্পষ্ট বিকল্প তৈরি হয়েছে। ঢাকা-১৮ আসনের মানুষ উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে যথেষ্ট সচেতন। ইনশাআল্লাহ, শেষ পর্যন্ত ব্যালটের মাধ্যমেই তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা ব্যক্ত করবেন। নির্বাচনী প্রচারণা জোটগতভাবেই পরিচালিত হবে বলেও তিনি জানান।

এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে আদীব বলেন, উত্তরখান, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত ও উত্তরা এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি হলো টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা। নির্বাচিত হলে সড়ক সম্প্রসারণ, বিকল্প সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং ড্রেনেজসহ একটি সমন্বিত রাস্তা উন্নয়ন ও গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে। পাশাপাশি উত্তরার তীব্র যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত টহল জোরদার করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
পরিকল্পিত, নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক নগরী গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই তরুণ প্রার্থী আরও বলেন, আমরা নিরাপদ আবাসন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, যানজটমুক্ত নগর, স্মার্ট হকার ব্যবস্থাপনা, হোল্ডিং ট্যাক্স-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং সবার জন্য সুলভ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করব।
একই সঙ্গে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজনে ওয়ার্ডভিত্তিক পর্যাপ্ত সরকারি স্কুল ও কলেজ স্থাপনের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এনসিপির এ নেতা।
আরএইচটি/এমজে
