ঢাকা- ০৭ : ধানের শীষ বনাম ফুটবলের লড়াই, সুযোগ খুঁজছে দাঁড়িপাল্লা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি দলটির এক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। অন্যদিকে, জোটগত কারণে এনসিপি প্রার্থী সরে দাঁড়ানোয় জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আসনের ভৌগোলিক ও ভোটার পরিচিতি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৩ থেকে ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনটি লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর ও কোতোয়ালির আংশিক এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮১ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১২ জন।
মাঠে লড়ছেন যারা
বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রচারণা চালাচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. হামিদুর রহমান হামিদ। এই আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও দলের সিদ্ধান্ত মেনে অনেকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে, দলটির যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইসহাক সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ এনায়েত উল্লাহ ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কৃষি ও শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রহমান ‘হাত পাখা’ প্রতীকে একক প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জোট (১০ দলীয় জোট) গঠনের কারণে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তারেক আহম্মেদ আদেল এবং মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন স্বতন্ত্র থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
নির্বাচনী মাঠের চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, বংশাল, চকবাজার ও নাজিরাবাজারের প্রতিটি মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে মহিলাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ায় জামায়াতের কর্মীরা বেশ আগে থেকেই মাঠে নেমে পড়েছেন বলে জানান স্থানীয় একাধিক সূত্র।
তারা বলছেন, জামায়াতের মহিলা শাখাও ঘরে ঘরে ভোট চাইতে সক্রিয় রয়েছেন। বংশালের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াত অনেক আগে থেকেই প্রচারণা শুরু করেছে। মহিলারাও ঘরে ঘরে গিয়ে লিফলেট দিচ্ছেন। ফলে এলাকায় তাদের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।’
অন্যদিকে, মনোনীত প্রার্থীর বাইরে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে একজন দাঁড়িয়ে যাওয়ায় বিএনপির ভোট দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নাজিরাবাজারের বাসিন্দা হাবিবুল্লাহ খান বলেন, ‘বিএনপিতে দলীয় প্রার্থী ও শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগ হয়ে যেতে পারে। এতে একক প্রার্থী হিসেবে জামায়াত বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
স্থানীয় প্রবীণ ভোটার আব্দুল কাদের বলেন, ‘একাধিক প্রার্থী থাকলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল তো হবেই। যারা একক প্রার্থী দিয়েছেন তাড়া বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।’
এলাকার সমস্যা ও জনদুর্ভোগ
পুরান ঢাকার এই অঞ্চলে গ্যাস ও পানির তীব্র সংকট, সরু রাস্তা, যানজট এবং কেমিক্যাল গোডাউনের ঝুঁকি প্রধান সমস্যা। ইতোপূর্বে সব সরকার এসব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোগান্তির সার্বিক চিত্র তেমন বদলায়নি।
চকবাজার এলাকার দোকান মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদ না হওয়ায় আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। সরু রাস্তার কারণে ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধার কাজ করা প্রায় অসম্ভব।’
লালবাগের সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাস্তাগুলো এতই ছোট যে রিকশা চললেও জট লেগে যায়। নির্বাচনের আগে অনেকে অনেক স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু আমাদের জীবনের ঝুঁকি বা নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধান হয় না।’
ভোগান্তি নিয়ে যা বলছেন ভোটাররা
স্থানীয়দের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সংকীর্ণ রাস্তা ও পুরোনো ভবনের কারণে উদ্ধার কাজ কঠিন হয়ে যাবে। ভূমিকম্পের চেয়েও সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো কেমিক্যাল গুদাম। চকবাজার ও আশপাশে অসংখ্য রাসায়নিক মজুত করে রাখার ঘর রয়েছে, যা এখনও চলমান। যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। চুড়িহাট্টা ও নিমতলী ট্র্যাজেডির কথাও মনে করিয়ে দেন তারা। বলেন, গুলশানসহ নতুন ঢাকার উন্নত অঞ্চলের তুলনায় পুরান ঢাকায় নাগরিক ঝুঁকি অনেক বেশি।
সাধারণ ভোটাররা জনপ্রতিনিধির কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, নাগরিকদের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। কেমিক্যাল গুদাম উচ্ছেদের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পুরান ঢাকার মানুষের জীবনমান বদলাতে প্রয়োজন পরিকল্পনামাফিক সাহসী উদ্যোগ। প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এগুলোর প্রাধান্য দিতে হবে।
সরু রাস্তা ও যানজট— অত্র এলাকার অন্যতম সমস্যা। স্থানীয় সেচ্ছাসেবক ও ভোটার মাসুদ রানা জানান, চার ওয়ার্ডের ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন। এলাকার চিহ্নিত সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই এলাকায় পানির চরম সমস্যা, রয়েছে গ্যাসের সমস্যাও। যানজটের কথা তো বাদ দিলাম। ট্রাফিক পুলিশের ওপর ভরসা না রেখে এখন আমরাই মাঠে নেমে পড়েছি। আশা করি, যারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তারা এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করবেন।’
লালবাগের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাপড় বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, এখন অনেকেই স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। আমরা কি আসলে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পাব? এখানকার রাস্তাগুলো খুবই সরু। দুইটা রিকশা চলতে পারে না। একপাশে চললে অপর পাশের যানবাহনগুলো আটকে যায়। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে। জরুরি সেবা পৌঁছাতে দেরি হওয়া প্রায় সময় মানুষদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
প্রার্থীদের আশ্বাস
বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমার এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও যানজট প্রধান সমস্যা। এছাড়া, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। আমি নির্বাচিত হলে আগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সমস্যার সমাধান করব।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ হাজি মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমাদের টিম একনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’
এমএসআই/এমএম

