শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক, মাঠে নামছেন জামায়াতের প্রার্থী

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আংশিক) আসনে শেষমুহূর্তে চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আসনটি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে চলমান টানাপড়েন এখন শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও সমঝোতার চেষ্টায় গড়িয়েছে। তবে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চললেও মাঠের বাস্তবতায় ভিন্ন চিত্র বিবেচনা নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামে এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম ও দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সফরে এসে পরিস্থিতির জটিলতা আঁচ করতে পারেন। ওইদিন বোয়ালখালীতে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে নাহিদ ইসলাম না গিয়ে নগরের একটি হোটেলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। বৈঠকে জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করে জানান, এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল ইসলাম আরিফকে দিয়ে চট্টগ্রাম-৮ আসনে নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হবে। তারা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, ডা. আবু নাছেরের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা এবং সংগঠনিক শক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন।
এদিন অস্থিরতার মধ্যেই বোয়ালখালী সফরে যান আসিফ মাহমুদ। সেদিন সেখানে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। ওইদিন তার উপস্থিতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওমর ফারুকের মা রুবি আক্তার চট্টগ্রাম-৮ আসনে উন্মুক্ত নির্বাচন দাবি করেন। তিনি বলেন, জোটের ভোট ২০ শতাংশ, স্থানীয় ভোট ৮০ শতাংশ। স্থানীয় মানুষ স্থানীয় প্রার্থীকে চায়। এসময় হয় ডা. নাছেরকে ছাড় অথবা আসনটিতে উন্মুক্ত নির্বাচনের দাবি জানান তিনি।
এরপর ২৬ জানুয়ারি কুমিল্লায় এনসিপি ও জামায়াতের নেতাদের আরেক দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে এনসিপির পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা করে সমঝোতার আশ্বাস দেওয়া হয় এবং স্থানীয়ভাবে সংকট সমাধানের অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে জোবাইরুল ইসলাম আরিফের সঙ্গেও জামায়াত নেতাদের আলোচনা অব্যাহত থাকে।
একপর্যায়ে জোবাইরুল উন্মুক্ত নির্বাচন অথবা নিজে নির্বাচন না করার বিষয়ে ভাবছেন– এমন তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ জানুয়ারি বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জামায়াতের শীর্ষ এক নেতা মোবাইলে বিষয়টি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে অবহিত করেন ও বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, এনসিপি নেতা আরিফকে নিয়ে দলটিতে বিভক্তি রয়েছে। তার পক্ষে দলের লোকেরাও পুরোপুরি মাঠে নামেননি। আবার তার গ্রাম সাতকানিয়া উপজেলায়। চট্টগ্রাম মহানগর ও বোয়ালখালী এলাকায় তিনি একেবারে অপরিচিত মুখ। এই এলাকার কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না আরিফুল।
জোবাইরুলের প্রার্থিতা নিয়ে এনসিপির মধ্যেও চলছে টানাপড়েন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিষয়ে এনসিপির চট্টগ্রামের যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। এতে তিনি লেখেন, কোনো লাভ হবে না। আপনি জিতবেন না। জামানত হারাবেন। কারণ আপনার যা দরকার ছিল তার কিছুই করেননি। অথচ বারবার বলেছিলাম। আপনার দলের লোকদেরকেই আপনি সাথে রাখেননি, ডাকেননি। জেতার জন্য যা যা দরকার ছিল তার কিছুই আপনি করেননি। হয়ত জিতে আসা আপনার আসল উদ্দেশ্য নয়, লক্ষ্য নয়।
‘কিন্তু এটা জোটের পক্ষ থেকে শিওর জেতা একটা আসন ছিল। বিএনপির সবচেয়ে দুর্বল প্রার্থী ও সুন্নীদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির ভোট ৫০-৫০ ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ফলে জামায়াত হয়ত সহজে জিতে আসতে পারত। জিনিসটা হলো না। এইবার নির্বাচনে কোনো কিছু নিশ্চিত না। যেকোনো কিছু হতে পারে। কোনো দলই অতিরিক্ত শক্তিশালী অবস্থানে নাই। ৭০+ সিটে হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী আছে। এমনও তো হতে পারে বিএনপি জোট জিতলো ১৪২ সিট, জামায়াত জোট জিতলো ১৩২ সিট। স্বতন্ত্র ও অন্যান্য জিতলো ২৬টা। সরকার গঠনের জন্য রাতভর স্বতন্ত্র বিজয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার আলোচনা হবে। কেনাবেচা হবে। ১টা আসন কত গুরুত্বপূর্ণ তখন বুঝবেন।’
এদিকে, আলোচনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছেরের নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত নেতারা নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) নগরের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও বায়েজিদ এলাকায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল ও গণসংযোগ করেন। এ দিন ডা. আবু নাছেরকে বোয়ালখালী এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যায়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে– কেন্দ্রে সমঝোতার আলোচনা চললেও তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত আপাতত পিছু হটছে না।
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদেরকে মাঠের বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করছি। আশা করি শিগগিরই বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।
এর আগে গত ২০ জানুয়ারি ১০ দলীয় জোটের আসন বণ্টনের ঘোষণায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপির জোবাইরুল ইসলাম আরিফকে জোটপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ওই ঘোষণার পর থেকেই জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। কারণ, এই আসনে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থাকা জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছেরকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, ডা. আবু নাছের প্রায় তিন দশক ধরে বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও এলাকায় চিকিৎসাসেবা, মানবিক সহায়তা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। মনোনয়ন ঘোষণার আগেই তিনি উঠান বৈঠক, গণসংযোগ, মেডিকেল ক্যাম্প ও ওষুধ বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
এমআর/এসএসএইচ