বিজ্ঞাপন

জুলাই সনদ নয়, সামগ্রিক সংস্কারের বিরোধিতা করছে সরকার : শিশির মনির

অ+
অ-
জুলাই সনদ নয়, সামগ্রিক সংস্কারের বিরোধিতা করছে সরকার : শিশির মনির

বর্তমান সরকার জনরায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে নানাবিধ দ্বিচারিতামূলক আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, তারা (সরকার) শুধু জুলাই সনদের বিরোধিতাই নয়, তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তারা মূলত সংস্কারের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘গণভোটের আলোকে জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি : সরকারের দায় ও জবাবদিহিতা‘ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আলোচকের বক্তব্যে একথা বলেন তিনি।

সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতারা এবং ছাত্র প্রতিনিধিরা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনরায়ের গুরুত্ব ও সরকারের অবহেলার বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির তার বক্তব্যে আইনি ও সাংবিধানিক দিক তুলে ধরে বলেন, ৭২-এর সংবিধান তৈরি হওয়ার পর প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল সংবিধানকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন করে একটি স্থায়ী সংকট তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা যেন চোর-পুলিশ খেলার মতো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি।

তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এমনভাবে এককেন্দ্রিক করা হয়েছে যে, যদি তা বিকেন্দ্রীকরণ করা না যায়, তবে যেই-ই ক্ষমতায় আসুক, সে বাধ্য হবে গণতান্ত্রিকভাবে নয়, বরং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে। এই কারণেই ‘জুলাই সনদ’-এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। 

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, পাশাপাশি দেশের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে—তা বাস্তবায়ন না হলে, ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারব না। বরং আবারও একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং দেশ পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

বিজ্ঞাপন

গণভোট বা জনমতের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনি সংকটের পাশাপাশি নৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শিশির মনির বলেন, এই সংবিধানের যদি জবান থাকতো আমার ধারণা সে বলতো যে আমারে নিয়ে আপনারা এত টানাটানি করবেন না। আমি আপনাদের এই ঝামেলার ভেতরে নাই। আপনারা যা পারেন করেন, সালাহউদ্দিন (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ভাইকেও বলতো আসাদ (আইনমন্ত্রী) ভাইকেও বলতো সবাইকে বলতো, দয়া করে আমাকে নিয়ে টানাটানি করে আমার ইজ্জত শরম আর নষ্ট করার দরকার নাই।

তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাদের কথার বাইরে গেলেই তারা ক্ষেপে যান। ১৩৩টা অর্ডিন্যান্স রিপোর্ট পাবলিশ হয়েছে গতকাল রাতে। সংস্কারের দুই ভাগ; একটা হলো সাংবিধানিক সংস্কার। এখানে আছে ৪৭টা, আরেকটা সংবিধানের বাইরে। অধ্যাদেশ আদেশ রেগুলেশন করে করা যাবে। এরকম আছে ৩৭টা। সব মিলে হইলো ৮৪টা। ৪৭টার ভেতরে একমত হইছে ৩০টা৷ বাকি থাকে ১৭টা। আর এখানে ৩৭টার ভেতরে কাজ করতে গিয়ে সরকার জারি করছে ১৩৩টা। এই অর্ডিনেন্সের ভেতরে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অর্ডিনেন্সকে বাদ করে দেওয়ার প্রস্তাব করছে। এক নম্বর বাদ করে দেওয়ার প্রস্তাব করছে- গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল। বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন গঠন অধ্যাদেশ বাতিল। দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, সংশোধন অধ্যাদেশ বাতিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় গঠন করার অধ্যাদেশ বাতিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ করার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ বাতিল। তা আছে কি? কোনটা আছে? 

শিশির মনির বলেন, জগতের মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে মনে করতেছে সরকারি দল বিরোধী দল সবই তো মরবে দেখি। এটা তো মরার বুদ্ধি। না হলে গুম-প্রতিরোধ প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করার কি কারণ থাকতে পারে? একমাত্র ডিজিএফআই সাটারিং ছাড়া আমি তো আর কিছু দেখি না। ডিজিএফআই আপত্তি ছাড়া এসবি এনএসআই এর আপত্তি ছাড়া এই আয়নাঘর তৈরি করার মূল কারিগর ডিজিএফআই। তাদের আপত্তি ছাড়া গুম এবং খুন পাস করার আপত্তি কি ভদ্র লোকের থাকতে পারে? তাহলে এটা কেন বাদ দিতে হবে?

তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। আমরা বুঝি, আমাদের মত এরকম সামান্য উকিলরা বুঝতেছি, তারা সরকার চালাচ্ছে তারা কি বুঝে না? গণভোট কি তারা অতীতে করে নাই? আমরা বুঝতেছি, জনগণ বুঝতেছে, এতো জ্ঞানী, বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তাদের! তারাও নিশ্চয়ই বুঝেন। নিশ্চয়ই সবকিছু জানেন। জানা সত্ত্বেও যখন একই কথা বলেন, তখন একটা সন্দেহের উদ্বেগ হয়। এই সন্দেহটার নাম হলো নিশ্চয়ই ক্ষমতার প্রক্রিয়াটাকে কোনো না কোনোভাবে স্মুথ করার জন্য এমন কিছু জিনিসের কাছে দায়বদ্ধ আছেন, যে দায়বদ্ধতা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের কল্যাণের চাইতেও অধিকতর তাদের জন্য কল্যাণকর। এছাড়া আমি আর কিছু দেখি না। 

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণ তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার টালবাহানা করছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনরায়ের অমর্যাদা করার পরিণতি শুভ হয় না। অনতিবিলম্বে জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী পদক্ষেপ না নিলে সরকারকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বিএনপির চরিত্র হচ্ছে, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা। ঐতিহাসিকভাবে তারা জনগণের রায়কে ভয় পায়। যাদের জন্ম হয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে, তারাই এখন গণভোটের বিপক্ষে অবস্থা নিয়েছে।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদের সঞ্চালনায় ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগার স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সেমিনারে বিশিষ্ট আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহীদুল আলম বলেন, আমাদের এ দেশকে কোনো না কোনোভাবে মেরামত করতে হবে। ‘জুলাই সনদ’ সেই মেরামতের কাজটিই করতে চায়। অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই জায়গায় পৌঁছেছি।

মেরামতের ক্ষেত্রে সবাই হয়তো একমত নাও হতে পারে, দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে আমরা যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাই, সেখানে পৌঁছতে হলে মেরামত করা প্রয়োজন। কিছু জায়গায় সমস্যা আছে বা মতভেদ রয়েছে বলে মেরামত বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

মতভেদ থাকা যেকোনো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিষয়। আমরা বিতর্ক করব, তর্ক করব, মতামত দেবো—তবুও আমাদের সবার মিলিত প্রচেষ্টায় এই দেশকে গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন, এবি পার্টি'র সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তাহসিন রিয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (জাকসু) জিএস মাজহারুল ইসলাম।

জেইউ/এসএম

বিজ্ঞাপন