ইসলামের প্রথম দূত ছিলেন যে সাহাবি

হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়। তবে এই ঐতিহাসিক যাত্রার আগে যে গভীর ও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি চলেছিল তা অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। সেই প্রস্তুতির সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। মদিনার মাটিতে ইসলামের বীজ বপনের জন্য মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকে বেছে নিয়েছিলেন।
হিজরতের প্রায় তিন বছর আগে হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজের মৌসুমে মক্কায় আসা বিভিন্ন গোত্রের শিবিরে ঘুরে ঘুরে ইসলামের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করতে বলতেন এবং তার বার্তা ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা ও আশ্রয়ের কথা তুলে ধরতেন।
এমন এক সময় ইয়াসরিবের খাজরাজ গোত্রের ছয়জন যুবকের সঙ্গে মহানবীর (সা.) সাক্ষাৎ হয়। ইসলামের কথা শুনে তাদের হৃদয় নরম হয়ে আসে। তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা সাধারণ মানুষ ছিলেন বলে নবীজি তখন তাদের কাছে কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক প্রতিশ্রুতি চাননি।
পরের বছর তারা আরও ছয়জনকে সঙ্গে নিয়ে আকাবা নামক স্থানে আবার নবীজির (সা.) সঙ্গে মিলিত হন। ইতিহাসে যা প্রথম আকাবার বাইয়াত নামে পরিচিত। সেখানে তারা অঙ্গীকার করেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবেন না, চুরি ও ব্যভিচার করবেন না, সন্তান হত্যা করবেন না এবং সৎ কাজে রাসুলের নির্দেশ অমান্য করবেন না।
ইয়াসরিব পরবর্তীতে মদিনা নামে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন সময়ে ইসলামের দাওয়াতের জন্য ছিল সম্ভাবনাময় জনপদ ছিল ইয়াসরিব। সামাজিকভাবে শহরটি ছিল বিভক্ত। মানুষ শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বের খোঁজে ছিল। নবীজি বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এমন একজনকে সেখানে পাঠাতে হবে, যিনি শুধু কোরআন শেখাবেন না, মানুষের আস্থা ও ভালোবাসাও অর্জন করতে পারবেন। এই দায়িত্বের জন্য মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে যোগ্য মনে করলেন তিনি।
কেন মুসআবই ছিলেন পছন্দের তালিকায়?
মুসআব (রা.) তখন বয়সে পরিণত, চিন্তায় ভারসাম্যপূর্ণ। স্বভাবতই দায়িত্ব পালনের মতো ধৈর্য, সংযম ও দৃঢ়তা ছিল তার মধ্যে। তিনি আগে দুইবার হাবশায় হিজরত করেছিলেন। ভিনদেশে বসবাস, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে চলাফেরার অভিজ্ঞতা তাকে সহনশীল ও প্রজ্ঞাবান করে তুলেছিল।
তিনি মক্কার সম্ভ্রান্ত গোত্র বনু আবদুদ্দারের সন্তান ছিলেন। এই পরিবারের ওপর কাবার চাবির দায়িত্ব ছিল। ফলে তিনি সামাজিকভাবে সম্মানজনক অবস্থানে ছিলেন। এ কারণে মদিনার মানুষ সহজেই তাকে গ্রহণ করতে পেরেছিল।
আরেকটি বড় বিষয় ছিল তার জীবনধারা। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিলাসী তরুণদের একজন। দামী পোশাক, সুগন্ধি, স্বচ্ছল জীবন, সবই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই তিনি এসব ত্যাগ করেন । এতে প্রমাণিত হয়, ইসলাম কোনো গরিবের আন্দোলন নয়; বরং সত্য ও ন্যায়ের পথে সবার জন্য এক আহ্বান। এই বার্তা মদিনার ধনী শ্রেণির মানুষকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাহাবিদের একজন। সরাসরি নবীজির কাছ থেকেই কোরআন ও দ্বীনের শিক্ষা নিয়েছিলেন। স্বভাবের দিক থেকেও তিনি ছিলেন অনন্য। শান্ত, ভদ্র, নম্র ও মিষ্টভাষী। তার কথায় ছিল দৃঢ়তা, আচরণে ছিল কোমলতা। ফলে মানুষ সহজেই তার কথা শুনত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি ছিলেন দুনিয়ার মোহমুক্ত। ইসলাম গ্রহণের পর তার মা তাকে সম্পদ ও স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। নেতৃত্ব, খ্যাতি বা প্রভাব, কোনোটাই তাকে টলাতে পারেনি। এই সব গুণ মিলিয়েই নবীজি তাকে নির্বাচন করেন মদিনায় ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে।
এক বছরে বদলে যায় একটি শহর
মদিনায় পৌঁছে মুসআব (রা.) নীরবে, ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে ইসলামের কথা শোনান, কোরআন শেখান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে গোত্র, দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এক বছরের ব্যবধানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, মদিনার প্রায় প্রতিটি ঘরেই কোনো না কোনো মুসলমান পাওয়া যায়।
এই প্রস্তুতির ফলেই পরের বছর ৭৫ জন মদিনাবাসী মক্কায় এসে নবীজিকে সসম্মানে তাদের শহরে হিজরত করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। নিঃশব্দ এই প্রচেষ্টাই মদিনাকে গড়ে তোলে ইসলামের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে। এখান থেকেই পরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়।
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) প্রমাণ করে গেছেন, ইতিহাস বদলাতে সব সময় তরবারির প্রয়োজন হয় না। কখনো শুধু দৃঢ় বিশ্বাস, নির্মল চরিত্র আর মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর ক্ষমতাই যথেষ্ট।
এনটি