নবী যুগে মসজিদ যেভাবে মুসলিম সমাজের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল

মসজিদে গিয়ে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসলিমরা। তবে মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। আধুনিক সময়ের ভাষায় বলা যায়, মসজিদ হলো মুসলিম সমাজের কমিউনিটি সেন্টার। ইসলামী চিন্তাবিদ ড. জাসের আওদা বলেছেন, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে মসজিদের প্রকৃত ভূমিকা নতুন করে ফিরিয়ে আনতে হবে।
ড. জাসের আওদার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে বহুমুখী কার্যক্রমের কেন্দ্র ছিল মদিনার মসজিদে নববী। ইবাদতের পাশাপাশি সমাজ পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হতো সেখানে।
মুসলিম সমাজে মসজিদের সাতটি প্রধান ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন তিনি—
১. নামাজের জন্য উন্মুক্ত
নবীজির যুগে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়ের প্রধান কেন্দ্র ছিল মসজিদে নববী। সেখানে পুরুষ-নারী, শিশু-বৃদ্ধ, আরব-অনারব সবার জন্য প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত ছিল। নারীরা আলাদা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীকালে কিছু এলাকায় নারীদের মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও রাসুলুল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, আল্লাহর বান্দিদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না।
বর্তমানে অনেক দেশে নারীদের জন্য অযত্নে রাখা ছোট জায়গা নির্ধারণ করা হয়, আবার কোথাও শিশুদের মসজিদে প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়। এটি নবীজির সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২. সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র
নবী যুগে মসজিদ ছিল মানুষের পারস্পরিক খোঁজখবর নেওয়ার স্থান। কোনো সাহাবিকে কয়েক দিন মসজিদে না দেখলে নবী করিম (সা.) নিজে তার খবর নিতেন, অসুস্থ হলে দেখতে যেতেন, প্রয়োজন হলে সাহায্যের ব্যবস্থা করতেন।
৩. দাওয়াতের কেন্দ্র
ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য আগ্রহীরা সরাসরি মসজিদে এসে প্রশ্ন করতেন। অমুসলিমদেরও মসজিদে প্রবেশে বাধা দেওয়া হতো না। বর্তমানে অনেক জায়গায় উল্টো চিত্র দেখা যায়।
৪. আনন্দ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের স্থান
নবী করিম (সা.) বিয়ের অনুষ্ঠান ঘোষণা করার জন্য মসজিদে আয়োজন করার এবং আনন্দ প্রকাশের কথা বলেছেন। ঈদের দিনও মসজিদে আনন্দঘন পরিবেশ থাকত। হজরত আয়েশা বর্ণনা করেছেন, একবার আফ্রিকান মুসলমানরা মসজিদের ভেতর বর্শা দিয়ে খেলার প্রদর্শনী করেছিল, আর তিনি নবীজির পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখেছিলেন।
৫. আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ হতো মসজিদেই। এখানেই অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৬. চিকিৎসা সেবার স্থান
ইসলামী সভ্যতায় হাসপাতাল গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত যুদ্ধাহত ও অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষার কাজও হতো মসজিদে নববিতে।
৭. শিক্ষার কেন্দ্র
অশিক্ষিত সাহাবিরা মসজিদেই পড়তে ও লিখতে শিখতেন। পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের বিশাল জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার ভিত্তিও গড়ে উঠেছে মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে।
ড. আওদা বলেন, মসজিদে একমাত্র যে কাজটি নিষিদ্ধ ছিল, তা হলো কেনাবেচা ও বাণিজ্যিক লেনদেন। নবী করিম (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মসজিদকে কোনোভাবেই বস্তুগত লাভের জায়গায় পরিণত করা যাবে না।
সব মিলিয়ে তার মন্তব্য, নবীজির যুগে মসজিদ ছিল এক জীবন্ত সমাজকেন্দ্র। যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা, সেবা, আলোচনা, আনন্দ ও মানবিকতার চর্চা হতো। সেই আদর্শে ফিরে যাওয়াই মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অন্যতম শর্ত।
সূত্র : অ্যাবাউট ইসলাম
এনটি
