অন্যের সঙ্গে সদাচরণ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের সঙ্গে সদাচরণ, হাসিমুখে কথা বলা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা একটি মানবিক গুণ ও সুস্থ সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য। কোরআনের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হলো সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য নম্রতা, সৌজন্য, দয়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসা নিশ্চিত করা। এর ফল হিসেবে গড়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক ঐক্য, মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ।
সদাচরণের প্রথম ও মূল স্তম্ভ হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাকওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১)
কোরআনের দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। জাতি, বর্ণ, ধনী-গরিব কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো ভেদাভেদ নেই। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
আরও পড়ুন
দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবেশী ও অচেনা মানুষের প্রতি সহানুভূতি মানবিক সমাজের ভিত্তি। ইসলামে হাসিমুখে কথা বলাকেও সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো; আর তোমরা যে কোনো সৎকর্মই করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটানো সদকা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)
প্রতিবেশী, আত্মীয় ও সমাজের প্রতি সদাচরণ ইসলামে শুধু নৈতিক উপদেশ নয়; বরং একটি দায়িত্ব। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, পথিক ও সাহায্যপ্রার্থীদের প্রাপ্য অধিকার আদায় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)
নবীজি (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
ন্যায়বিচার ও সততা সদাচরণের মেরুদণ্ড। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৩৫)
সদাচরণ ও সহানুভূতির প্রসার একটি মানবিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা মানুষের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ী ও সহানুভূতিশীল। তিনি বলেছেন, ‘উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।’ (তিরমিজি)
রূঢ়তা, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা ফরজ। শান্তি ও সহানুভূতির পথে অগ্রসর হওয়াই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬১)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মানুষের কল্যাণ করো, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণ করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৫)
এ হাদিসই মানুষের সাথে সদাচরণ, হাসিমুখে কথা বলা ও সহানুভূতির সর্বোত্তম রূপরেখা।
লেখক: মুহাদ্দিস ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক