বৃহস্পতি নাকি শুক্রবার রোজা শুরু হবে?

এ বছর রমজান শুরু হবে কবে এবং শুরুর দিনটি বৃহস্পতিবার হবে নাকি শুক্রবার? মুসলিম বিশ্বের এমন কৌতূহল নিয়ে জ্যোতির্বিদরা বিশ্লেষণ করে বলছেন, যেসব দেশ নিশ্চিত চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজান ঘোষণা করে, সেখানে শাবান মাস ৩০ দিনে পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে রমজান শুরু হতে পারে বৃহস্পতিবার।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, মরক্কো, মৌরিতানিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি হবে শাবানের ২৯তম দিন। ওই দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হবে। এসব দেশে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে রমজান শুরু হতে পারে বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি বা শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি।
আমিরাতে ১৪৪৭ হিজরির রমজানের চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হবে আগামী মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি। তবে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদদের মতে, ওই দিন আরব ও মুসলিম বিশ্বের কোথাও খালি চোখে কিংবা টেলিস্কোপ ব্যবহার করেও নতুন চাঁদ দেখা সম্ভব নয়। এ কারণে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রমজান ঘোষণা করা দেশগুলোতে পবিত্র মাসটি শুরু হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ধরা হচ্ছে বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ কেন্দ্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সব চাঁদ দৃশ্যমানতা মানদণ্ড অনুযায়ী মঙ্গলবার সূর্যাস্তের সময় চাঁদ নতুন অবস্থান থেকে এতোটাই কাছাকাছি থাকবে যে কোনোভাবেই তা দৃশ্যমান হবে না। এই সিদ্ধান্ত একাধিক গবেষণাভিত্তিক মানদণ্ডে একই রকম পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইবনে তারিক, ফাদারিংহাম, মন্ডার, ব্রুইন, মোহাম্মদ ইলিয়াস, দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যোতির্বিদ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ইয়ালপ ও ওদেহ পদ্ধতি। সব বিশ্লেষণেই বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরব বিশ্ব বা বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে কোথাও চাঁদ দেখা অসম্ভব।
ফলে যেসব দেশে শরিয়তসম্মতভাবে চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ওপর নতুন মাস শুরু হয়, সেখানে বুধবার শাবানের ৩০ দিন পূর্ণ হবে এবং বৃহস্পতিবার রমজান শুরু হবে। তবে কিছু দেশ ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করে এক দিন আগে, অর্থাৎ বুধবার থেকেই রমজান ঘোষণা করতে পারে। এ সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার কেন চাঁদ দেখা যাবে না?
জ্যোতির্বিদরা বলছেন, সূর্যাস্তের সময় সূর্যের সঙ্গে চাঁদের অবস্থানগত দূরত্ব অত্যন্ত কম থাকায় মঙ্গলবার চাঁদ দেখা সম্ভব নয়।
ইসলামী বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে সূর্যাস্তের আগেই চাঁদ অস্ত যাবে। মধ্যাঞ্চলে সূর্য ও চাঁদ প্রায় একই সময়ে অস্ত যাবে। আর পশ্চিমাঞ্চলে সূর্যাস্তের পর মাত্র কয়েক মিনিট চাঁদ থাকবে, যা দৃশ্যমান হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এ ক্ষেত্রে হিসাব করা হয়েছে চাঁদের নিচের প্রান্ত ধরে, যেখান থেকে নতুন চাঁদ দেখা যায়। এতে বোঝা যায়, চাঁদ আসলে কতক্ষণ দিগন্তের ওপরে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, জাকার্তায় সূর্যাস্তের ছয় মিনিট আগেই চাঁদ অস্ত যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক মিনিট আগে, রিয়াদে ৪২ সেকেন্ড আগে চাঁদের নিচের অংশ দিগন্তের নিচে চলে যাবে। সৌদি আরবের তাবুক অঞ্চলে সূর্যাস্তের ঠিক সময়েই চাঁদ অস্ত যাবে। একই রকম পরিস্থিতি থাকবে আম্মানেও।
কায়রোতে সূর্যাস্তের দুই মিনিট পর চাঁদ অস্ত যাবে, আর আলজিয়ার্সে মাত্র ছয় মিনিট চাঁদ দিগন্তে থাকবে।
ফরাসি জ্যোতির্বিদ আন্দ্রে ডাঁজঁর নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী, সূর্য ও চাঁদের কৌণিক দূরত্ব নির্দিষ্ট মাত্রার কম হলে চাঁদ দেখা সম্ভব নয়। মঙ্গলবার সব অঞ্চলেই এই সীমার অনেক নিচে থাকবে দূরত্ব।
আধুনিক প্রযুক্তিতেও অসম্ভব
সবচেয়ে আধুনিক জ্যোতির্বিদ ক্যামেরা ও ইমেজ প্রসেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মঙ্গলবার চাঁদ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঐতিহাসিক তথ্যেও দেখা যায়, এত কম দূরত্বে কখনোই খালি চোখে বা টেলিস্কোপে চাঁদ দেখার প্রমাণ নেই।
এ ছাড়া মঙ্গলবার বিকেলে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, যা সূর্য ও চাঁদের একই সরলরেখায় অবস্থান নির্দেশ করে। এটিও চাঁদ না দেখার বিষয়টি আরও নিশ্চিত করে।
এ কারণে মঙ্গলবার ভুয়া চাঁদ দেখার দাবি নিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পশ্চিম আকাশে শুক্র গ্রহ চাঁদের কাছাকাছি অবস্থান করায় বিভ্রান্তির ঝুঁকি রয়েছে, যা অতীতেও দেখা গেছে।
বাংলাদেশসহ কয়েক দেশে চাঁদ দেখা হবে বুধবার
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, মরক্কো, মৌরিতানিয়া এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি হবে শাবানের ২৯তম দিন। ওই দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হবে। এসব দেশে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে রমজান শুরু হতে পারে বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি বা শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি।
জ্যোতির্বিদদের মতে, বুধবার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি অনেক বেশি অনুকূল থাকবে। তখন আরব বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় খালি চোখেই চাঁদ দেখা সম্ভব হবে, যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে।
বিশেষজ্ঞ ও আলেমরা জানিয়েছেন, যেখানে জ্যোতির্বিদ গণনায় প্রমাণিত যে সূর্যাস্তের আগেই চাঁদ অস্ত গেছে, সেখানে চাঁদ দেখার চেষ্টা করার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন সৌদি আরবের শীর্ষ আলেমদের একজন শায়খ আবদুল্লাহ বিন মানি, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই নির্ভরযোগ্য জ্যোতির্বিদ তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন।
সূত্র : গালফ নিউজ
এনটি