বিশ্বজুড়ে রমজান উদযাপনের ৭ ব্যতিক্রমী রীতি

মুসলিম বিশ্বের প্রতীক্ষিত মাস পবিত্র রমজান। নামাজ, রোজা, দান-সদকা ও আত্মসংযম মৌলিক এই ইবাদতগুলো সব দেশেই একই রকম। এতে ভিন্নতার কোনো সুযোগ নেই। তবে দেশ ও সংস্কৃতি ভেদে রমজান পালনের ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও ইফতারের সময় কামানের গর্জন শোনা যায়, কোথাও সেহরির সময় ঘুমন্ত রোজাদারদের জাগানো হয় ঢোলের তালে তালে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ছোঁয়ায় এভাবেই বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পবিত্র রমজান মাস।
নামাজ, রোজা ও ইবাদত ছাড়াও বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতি রমজান মাসে নিয়ে আসে ভিন্ন মাত্রা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রমজানের সাতটি ব্যতিক্রমী ও আকর্ষণীয় রীতি তুলে ধরা হলো—
১. কামানের গোলায় ইফতারের সময় জানানো
রমজানের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য ইফতারের সময় কামানের গোলার শব্দে ইফতারের সময় জানানো। মিসরে এই রীতির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। সূর্যাস্তের সময়, মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে একটি কামানের গোলা ছুড়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা হয়।
ঘড়ি ও লাউডস্পিকারের প্রচলন শুরুর আগে কামানের মাধ্যমে ইফতারের গণঘোষণা দেওয়া হতো। এখনও সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও বাহরাইনে এই ঐতিহ্য টিকে আছে।
২. রঙিন ফানুসে রমজানের বার্তা
মিসরের ঐতিহ্যবাহী রমজান লণ্ঠন ফানুস এখন মুসলিম বিশ্বের পরিচিত প্রতীক। রমজান এলেই মিসরের ঘরবাড়ি, রাস্তা, রেস্তোরাঁ, হোটেল ও বিপণিবিতানগুলো সাজানো হয় রঙিন ফানুসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশে রমজানের আনন্দ ও উৎসবের আবহ ছড়িয়ে দিয়েছে এই আলোকসজ্জা।
৩. সেহরির সময় ঢোল বাজিয়ে জাগানো
সেহরির সময় মানুষকে জাগাতে ঢোল বাজানোর প্রথা শত শত বছরের পুরোনো। সেহরির সময় মানুষকে জাগানোর জন্য যে ব্যক্তি সবাইকে ডাকেন আরব দেশগুলোতে তাকে মেসাহারাতি, তুরস্কে দাভুলচু, আর উপমহাদেশে সেহেরিওয়ালা বলা হয়।
এই মানুষেরা ভোরের আগে ঢোল বাজিয়ে ও ছন্দে ছন্দে ডাক দিয়ে পাড়া-মহল্লা ঘুরে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে তোলেন।
তুরস্কে এই ঢোলবাদকেরা প্রায়ই উসমানি আমলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন। ইন্দোনেশিয়ায় সেহরি ও ইফতারের সময় জানান দিতে বেদুগ নামে বড় ঢোল ব্যবহার করা হয়।
৪. সেহরি ও ইফতারে নগর ঘোষক বা নাফার
ঢোলের পাশাপাশি কিছু দেশে সেহরির বার্তা পৌঁছে দেন নগর ঘোষক। মরক্কোয় এদের বলা হয় নাফার। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার আগে তারা পাড়া ঘুরে রোজা, সেহরি, নামাজের সময় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতেন। কোনো কোনো অঞ্চলে এই ভূমিকা মেসাহারাতির সঙ্গে মিলে যায়।
৫. হাগ আল লায়লা
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজানের আগে পালিত হয় হাগ আল লায়লা। শাবান মাসের ১৫ তারিখে এই উৎসবের মাধ্যমে রমজানের কাউন্টডাউন শুরু হয়। শিশুরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায় এবং মিষ্টি ও বাদাম সংগ্রহ করে। এর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দানশীলতা ও সামাজিক বন্ধনের শিক্ষা দেওয়া হয়।
৬. পূর্বপুরুষের স্মরণ ও সম্মিলিত স্নান
রমজান ঘিরে বিভিন্ন রীতি পালন করেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের দেশ ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকেরা। এর মধ্যে জনপ্রিয় নগাবুবুরিত। এর মাধ্যমে মূলত ইফতারের আগে বিকেলের সময়টুকু বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করা হয় এবং পার্কে হাঁটা ধর্মীয় আলোচনা শোনা বা খাবারের দোকানে ভিড় করা করেন ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা।
জাভা অঞ্চলে রমজানের শেষ দিকে তাকবিরান মিছিল হয়, যেখানে তরুণেরা আল্লাহর প্রশংসায় তাকবির ধ্বনি দিতে দিতে লণ্ঠন হাতে রাস্তায় বের হন।
রমজানের আগে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারতের রীতি রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় একে নিয়াদরান বলা হয়। জাকার্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় এটি শ্রদ্ধা ও স্মরণের অংশ।
এ ছাড়া রোজা শুরুর এক-দুদিন আগে পাডুসান নামে একটি প্রথা রয়েছে, যেখানে মানুষ প্রাকৃতিক ঝরনা, নদী বা জলাশয়ে সম্মিলিতভাবে গোসল করে আত্মশুদ্ধির অনুভূতি লাভ করে।
৭. চাঁদ রাত
চাঁদ রাত অর্থ চাঁদের রাত। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদুল ফিতরের আগের রাতের একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন। নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে রমজানের সমাপ্তি ও শাওয়াল মাসের সূচনা হয়।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মানুষ খোলা জায়গায় জড়ো হয়ে চাঁদ দেখেন, একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। নারীরা মেহেদি লাগান, ঘরে ঘরে ঈদের মিষ্টি তৈরি হয়, আর শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় জমে ওঠে বাজার।
রমজানের রীতি দেশভেদে ভিন্ন হলেও এর মূল চেতনা এক। আর তাহলো সংযম, ইবাদত ও মানবিকতা। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মাঝেও রমজান সারা বিশ্বের মুসলমানদের এক সুতোয় বাঁধে।
সূত্র : খালিজ টাইমস
এনটি