যেসব গুণে আদর্শ নেতা চেনা যায়

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; সমাজ, রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। কোরআন ও সুন্নাহতে আদর্শ নেতৃত্বের যেসব গুণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো অনুসরণ করলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব। তাই নেতা নির্বাচন বা নেতৃত্বের মূল্যায়নের সময় ইসলাম যে মানদণ্ড সামনে রেখেছে, তা জানা প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের জন্য জরুরি।
প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ : ইমান ও তাকওয়া।
আল্লাহভীতি ছাড়া কোনো নেতৃত্বই প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।
একজন নেতা যদি আল্লাহর জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন এবং মানুষের হক নষ্ট করবেন না।
দ্বিতীয় গুণ : ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফ।
ইসলামে নেতৃত্ব মানেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব। আত্মীয়তা, দলীয় স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত লাভের কারণে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় যারা থাকবেন, তাঁদের একজন হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। এই হাদিসই প্রমাণ করে, ন্যায়বিচার নেতৃত্বের মূল স্তম্ভ।
তৃতীয় গুণ : যোগ্যতা ও দক্ষতা।
ইসলাম অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণকে আমানতের খেয়ানত হিসেবে দেখেছে। কোরআনে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কথা বর্ণিত হয়েছে, তিনি নিজেই বলেন, আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্ব দিন, আমি রক্ষণাবেক্ষণকারী ও জ্ঞানী। অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা জরুরি। শুধু জনপ্রিয়তা বা আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব যোগ্যতা দেখেই নেতা নির্বাচন করার উৎসাহ দেয় ইসলাম।
চতুর্থ গুণ : আমানতদারি ও সততা।
নেতা হলেন জনগণের আমানতদার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত সবই এক ধরনের আমানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো। আমানত নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ হলো অযোগ্য ও অসৎ লোকের হাতে নেতৃত্ব দেওয়া।
পঞ্চম গুণ : জনগণের প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধ।
ইসলামে নেতা শাসক নন, বরং খাদেম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আদর্শ নেতা জনগণের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করবেন, দুর্বলদের পাশে দাঁড়াবেন এবং ক্ষমতাকে সেবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবেন।
ষষ্ঠ গুণ : পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা।
ইসলাম একনায়কতাকে উৎসাহ দেয় না। কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তাদের কাজ পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। একজন আদর্শ নেতা নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করবেন না; বরং আলেম, বিশেষজ্ঞ ও জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন।
সবশেষে রয়েছে সাহস ও দৃঢ়তা। সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হলে সাহস দরকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে চাপ, সমালোচনা বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকতেই পারে। আদর্শ নেতা সেই চাপে নতি স্বীকার করবেন না।
সব মিলিয়ে ইসলামের আলোকে আদর্শ নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ, যোগ্য, আমানতদার, জনদরদি, পরামর্শপ্রবণ ও সাহসী। সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য নেতা নির্বাচনের সময় এসব গুণ বিবেচনায় নেওয়াই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
এনটি