মা-বোনকে পাহারা দেওয়া সেই রাত গড়ে তুলেছিল রভম্যান পাওয়েলকে

সেই রাতটা ছিল প্রচণ্ড কষ্টের। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। টিনে চাল দেওয়া একটি অসম্পূর্ণ ঘরের ভেতরে ফাটল দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ছিল। মেঝে ভেসে যাচ্ছে। ঘরের মাঝখানে একটি তোশক। খুব সাবধানে সেটি শুকনো জায়গায় রাখা হয়েছিল। ঘরে ১১ বছরের একটি ছেলে তার মাকে বলছিল: ‘চিন্তা করো না, মা। তুমি ঘুমাও। আমি পানি সামলে নেব।’
হয়তো কোনো ক্রিকেটের গল্প নয় এটি। আসলে এটা ছিল টিকে থাকার গল্প, যা কোনো অ্যাকাডেমিতে শেখানো যায় না। এটি ছিল সুরক্ষিত রাখার প্রবৃত্তির গল্প, যা প্রয়োজনের তাগিদে সৃষ্টি হয়। কীভাবে একটি ছেলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সংসারের একমাত্র অভিভাবক হয়ে ওঠে, সেই গল্প।

রভম্যান পাওয়েল, ক্যারিবীয় এই তারকার বিধ্বংসী ব্যাটিং বিশ্বের তাবৎ বোলারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। তিনি এখন লিগগুলোতে খেলে এত অর্থ উপার্জন করেন, যা সেই ভেজা পায়ের ছোট্ট ছেলেটির জন্য ছিল রূপকথার গল্প। কিন্তু সেই স্যাঁতসেঁতে রাতগুলোর স্মৃতি আজও তার কাছে এতটাই স্পষ্ট, যেন সবকিছু হয়েছিল এই তো কদিন আগে। নিজের মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ জন্মেছিল তার, ‘আমি ঘরে একজন পুরুষ অভিভাবকের গুরুত্ব বুঝতাম। আমিই ছিলাম সেই পুরুষ অভিভাবক।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার মা ছিলেন একা (সিঙ্গেল মাদার), আর সঙ্গে ছিল আমার বোন। একজন পুরুষ হিসেবে পরিবারকে রক্ষা করা কাজেরই অংশ। এসব করা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।’
স্বাভাবিক! বাতাসে ভাসতে থাকে শব্দটি। ১১ বছরের একটি ছেলের কাছে কীভাবে এসব স্বাভাবিক? তার তো থাকার কথা ছিল বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঠে, তার চিন্তিত হওয়া উচিত ছিল স্কুলের হোমওয়ার্ক করা নিয়ে। কিন্তু টিকে থাকার কোন ব্যাকরণ একটি ১১ বছরের ছেলেকে শেখায় যে, তাকেই জেগে থাকতে হবে?

নিজের শৈশব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি অর্থনীতির কথা টেনে আনেন, ‘আমি এমন এক ছোট পরিবারে বড় হয়েছি যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই ছিল বেঁচে থাকার পথ; যার ফলে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশি থাকত। জ্যামাইকার মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে অনেকেরই আর্থিক ভিত্তি মজবুত থাকে না। আমার মা জোয়ান অনেক পরিশ্রম করতেন, আমাদের জন্য তিনি লড়াই করেছেন।’ পাওয়েল বছরের পর বছর তার মাকে সেই অসম্পূর্ণ ঘরটি তিলে তিলে গড়ে তুলতে দেখেছেন। তবুও সম্পূর্ণ হচ্ছিল না।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মধ্যে আত্মউপলব্ধি তৈরি হয়। তিনি মাকে একটি কথা দিয়েছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে মাকে বলেছিলেন, ‘আমার কথা শোনো। আমি সব কিছু বদলে দেব। শুধু আমাকে সময় দাও। আমি এখন ছোট, কিন্তু বড় হলেই সব পাল্টে দেব।’

পাওয়েল তার শৈশবের হিসাবনিকাশ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম যে ক্রিকেট অথবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হবে আমার পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার চাবিকাঠি।’ আর তার মা তাকে বিশ্বাস করেছিলেন, সেটাই ছিল তার কাছে বড় বিষয়। তিনি স্কুলেও পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং ক্রিকেটও খেলতেন সর্বোচ্চটা দিয়ে— কারণ তিনি জানতেন এটিই তার পরিবারের খেয়াল রাখতে পারবে। খেলার প্রতি ভালোবাসা থেকে খেলতেন না।
কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে আরেকটি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত আসে। তার শিক্ষক নিকোলাস ডিলন বাবাদের নিয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন। পাওয়েল কান্নায় ভেঙে পড়েন, কারণ তিনি তার বাবাকে চিনতেন না। তার বাবা তো তার মাকে শুরুতেই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
শিক্ষক ডিলনের কথা পাওয়েলের জীবন বদলে দেয়, ‘এই অভাব যেন তোমার বাধা হিসেবে না দাঁড়ায়। এটাকে বড় হওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করো, যেন তুমি তোমার বাবার ঠিক উল্টো মানুষ হতে পারো।’ শিক্ষক ও ছাত্রের সেই সম্পর্ক বাবা-ছেলের সম্পর্কে রূপ নেয়। তারা এখনো সপ্তাহে এক-দুইবার কথা বলেন। পাওয়েল বললেন, ‘তার প্রতি অনেক শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা।’
ক্রিকেট চলে আসে সামনে। জ্যামাইকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ভালো করার পর তার মনের মধ্যে বিশ্বাস দেখা দেয়— হয়তো সম্ভব। এরপর রবার্ট স্যামুয়েলসের অধীনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ করেন, যিনি আজও তার ব্যাটিং কোচ। অবশেষে সেই ক্ষণ আসে, তিনি সিপিএলে জ্যামাইকা তালাওয়াসের হয়ে ভালো দামে দল পান।
টাকা পাওয়ার পর তার প্রথম চিন্তা কী ছিল? তিনি বললেন, ‘আমি এত টাকা দিয়ে কী করব? আমি আগে কখনো এত টাকা দেখিনি।’ তার প্রথম খরচ কোনো গাড়ির পেছনে ছিল না। পরে অবশ্য কিনেছিলেন। তিনি তার মাকে ঋণের তালিকা করতে বলেন— টেলিভিশন, ফ্রিজ, চুলা... সব ঋণ তিনি শোধ করে দেন। তিনি বললেন, ‘এটি তার কাঁধ থেকে সব বোঝা নামিয়ে দিয়েছিল। এখন তিনি অনেক নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারেন।’

পাওয়েল বিশ্বাস করেন, শৈশবের সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল আজ তার ব্যাটিংয়ে দেখা যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘খুব অল্প বয়সেই আপনার মধ্যে এক প্রাকৃতিক ও শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারেন।’ যদি পানি টানতে হতো, তিনি টানতেন। যদি কিছু তোলার প্রয়োজন হতো, তিনি তুলতেন। তার মন জেনে গিয়েছিল যে তাকেই সব দায়িত্ব বহন করতে হবে এবং সেটা শিখে গিয়েছিল তার শরীরও। তিনি বললেন, ‘এখন সেটিই আমার ক্রিকেটে ফুটে ওঠে, যেখানে একজন শক্তিশালী ও যত জোরে সম্ভব বল মারার চেষ্টা করে।’ তার পেশির শক্তি যেন তার আত্মজীবনীরই অংশ।
এখন মাঝেমাঝে পাওয়েল তার মায়ের সঙ্গে বসে এই দিনগুলো নিয়ে হাসাহাসি করেন। ঘুণাক্ষরেও ক্রিকেট খেলে সারা বিশ্ব ঘোরার স্বপ্ন দেখেননি তিনি, ‘কল্পনা মাঝেমধ্যে এমন যে আপনি যতদূর দেখতে পাবেন, ততদূরই।’
আইপিএলে চুক্তি ও দুবাইয়ে আইএলটি২০-র পারফরম্যান্স— সব লিগ ও ছক্কার বৃষ্টির মাঝেও তিনি কখনো ভোলেননি কী ছিলেন, ‘আমি সবসময় শেকড়েই থেকে গিয়েছি, আমি কে, কোথায় ছিলাম, ভুলিনি।’

পাওয়েল মুম্বাইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলবেন। তিনি বড় বড় ছক্কা মারবেন। যে ১১ বছরের ছেলেটি একসময় পাহারা দিতো, তার মা আর বোনকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে রাত জেগে কাটাত, তার কাছে তো বিশ্বকাপের চাপ কিছুই না। শেষ পর্যন্ত তিনি তার কথা রেখেছেন। ঘরটি সম্পন্ন হয়েছে। সব ঋণ শোধ হয়েছে। স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।
জ্যামাইকায় এখনো বৃষ্টি পড়ে, কিন্তু যখন পড়ে পানি আর ছাদ চুঁইয়ে পাওয়েলের ঘরে পড়ে না। এখন নিশ্চিন্তে তার মা-বোন ঘুমাতে পারেন, বিশ্ব ঘুরতে থাকা পাওয়েলও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
এফএইচএম/