বাংলাদেশি কোচ সেলিমে ভরসা অস্ট্রেলিয়ানদের

রোববার ছুটির দিন। সপ্তাহব্যাপী কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনে একটু বাসায় আয়েশ করেই কাটানোর কথা কর্মজীবী বাবা-মায়ের। কিন্তু এই দিনে অনেক বাবা-মা সন্তানকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার বানাতে তাদের সঙ্গে সারাদিনই মাঠে থাকেন। গতকাল পার্থে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার মাঠে দেখা গেল ত্রিশ জনের মতো অভিভাবককে। তারা চেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছেন, আর নিজ নিজ ছেলের ব্যাটিং-বোলিং দেখছেন।
বিজ্ঞাপন
পার্থে ক্রিকেটের এমন আবহ গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার মাহবুবুর রহমান সেলিম। তিনি স্বীকৃতি ওয়ানডে খেলেছেন একটি। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ওয়ানডে ম্যাচ বেশ ঐতিহাসিক। মেহরাব হোসেন অপি বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘ না হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে আবাহনীর হয়ে খেলেছেন বেশ কয়েক মৌসুম।
সেলিম দুই দশক আগে থেকেই অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবনযাপন করছেন। তার গড়া পার্থ ক্রিকেট মেন্টরিং ক্লাবে ক্রিকেট শিখেন অস্ট্রেলিয়ান ও পার্থে বসবাস করা ভারত, পাকিস্তান, লঙ্কান প্রবাসীর সন্তানরা।
বিজ্ঞাপন
জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সেলিম পার্থের ক্রিকেটে কাজ করছেন, এই ধরনের একাধিক প্রতিবেদন দেশে থেকেই করা হয়েছিল। তবে পার্থে সশরীরে এসে অনেকটাই অভিভূত হতে হয়েছে সন্তানদের ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের নিবেদন ও বাংলাদেশি একজন ক্রিকেটারের প্রতি তাদের আস্থা-ভালোবাসায়।
পেশায় আইনজীবী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ড্যামিয়েন। ছুটির দিনে সন্তানকে নিয়ে ইউডব্লিউএ ক্যাম্পাস মাঠে। সেলিমের কোচিং ও পার্থ মেন্টরিং ক্লাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘সেলিম অত্যন্ত ভালো মানের কোচ। সে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলেছে, তার জ্ঞান যথেষ্ট। এই ক্লাব থেকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বয়সভিত্তিক দলে অনেকে জায়গা পাচ্ছে।’
আরেক অস্ট্রেলিয়ান অভিভাবক বলেন, ‘পার্থে শীতকালে তেমন ক্রিকেট হয় না। সেলিম শীতকালেও ক্রিকেট আয়োজন করে। এতে বাচ্চাদের পারফরম্যান্স ও ফিটনেসের ধারাবাহিকতা থাকে। সেলিম টেকনিক্যাল ও ফিজিক্যাল দুই দিকেই কাজ করেন দারুণভাবে।’
বিজ্ঞাপন

সেলিমের অধীনে কোচিং করা অস্ট্রেলিয়ান তরুণ জো হ্যাকিন্স। তিনি বেশ খুশি সেলিমের কোচিংয়ে, ‘২ বছর ধরে আমি মিস্টার সেলিমের কাছে কোচিং করছি। আগে ১৫-২০ রানের বেশি করতে পারতাম না। এখন টেকনিকে উন্নতি হয়েছে, অনেক ম্যাচেই ফিফটি করছি।’
ভারতীয় প্রবাসী অমিতাভ পার্থে থাকেন ৷ তার ছেলেকে সেলিমের কাছে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘পার্থ মেন্টরিং ক্লাবের সিস্টেম খুব ভালো। অনুশীলন মান, সুযোগ সুবিধা অন্য যে কোনো একাডেমি বা ক্লাবের চেয়ে কম নয়। এজন্য বাচ্চাকে এখানে দিয়েছি।’
এখন সেলিমের কোচিং ও ক্লাব বেশ জনপ্রিয়। এক যুগ আগে সেটা এ রকম ছিল না। কঠিন সময় নিয়ে সেলিম বলেন, ‘নিজেকে ক্রমেই পরিণত করেছি। ওয়াকা গ্রাউন্ড, এখানের ক্লাবে আমি কাজ করেছি। এতে আমি পরিণত হয়েছি এবং আস্থা অর্জন করতে শুরু করি। শুরুর দিকে ক্লাবে এত প্রশিক্ষণার্থী ছিল না। তবে এখন সংখ্যাটা অনেক।’
অস্ট্রেলিয়ান, লঙ্কান, ভারত, পাকিস্তানের অনেকে আসলেও বাংলাদেশের কাউকে দেখা যায়নি অনুশীলনে। এ নিয়ে সেলিম বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট কেন, যে কোনো খেলার খেলোয়াড় হতে হলে ১৬-১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অভিভাবকদের সাপোর্ট লাগবেই। কারণ অভিভাবকরাই ড্রাইভ করে বাচ্চা নিয়ে আসে। অভিভাবকরা চায় তাদের বাচ্চা ক্রিকেটার, ফুটবলার হোক। বাংলাদেশি প্রবাসীরা তাদের সন্তানদের ক্রীড়াবিদ বানানোর জন্য তেমন আগ্রহী নয়।’
অভিভাবকদের আগ্রহ আসলেই অনেক। সেলিম কোচিং করালেও প্রস্ততি ম্যাচ চলাকালে আম্পায়ারিং, স্কোরিং করেন অভিভাবকরা। ছুটির দিন তো পুরো সময়ই দেন, অন্য দিনও আসেন বাচ্চার সঙ্গে।
পার্থ র্যাকটেঙ্গুলার স্টেডিয়াম থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরত্ব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তনের বড় অংশ জুড়েই স্পোর্টস ক্লাব। সুবিশাল সবুজ মাঠ। যেখানে একই সঙ্গে দেখা গেল ফুটবল, রাগবি ও ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। পাশে রয়েছে হকি খেলার জায়গাও। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ এত মনোরম ও সুন্দর যা বাংলাদেশে বেশ কল্পনাতীতই।
বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার মাহবুবুর রহমান সেলিমের পার্থ ক্রিকেট মেন্টরি ক্লাবের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা রয়েছে। এজন্য তারা মাঠ ব্যবহারের সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ হলেও উইকেট, আউটফিল্ড সবই দারুণ।
এজেড/এফএইচএম