শব্দবিহীন ও আয়োজনহীন প্রস্তুতি। প্রত্যন্ত গ্রামের বখাটে তরুণ-তরুণী, বন্ধু-বান্ধবীরা মিলিত হয়ে হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা-মাস্তি আর সঙ্গে কিছু মজাদার কর্মকাণ্ড সংযুক্ত করে ভিডিও তৈরি করেন। এভাবেই মানুষকে প্রতিনিয়ত আনন্দ দিয়ে আসছে এই ইউটিউব চ্যানেলটি। এতে চ্যানেলটির গ্রাহক হয়েছে কোটিরও বেশি। কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক বেকারের।

নওগাঁ নিয়ামতপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের তরুণ ইউটিউবার মতিউর রহমান মিঠুনের মাহা ফান টিভি (Maha fun tv) চ্যানেলটি এভাবেই পরিচিত হয়ে ওঠে। দেশের অনেক নামি-দামি চ্যানেলকে টপকে ওপরে অবস্থান করছে চ্যানেলটি। যার ১ কোটি ৪৩ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইব রয়েছে।

সালটা ২০১৬। শুরুটা ছিল স্যামসাং জে-২ মোবাইল দিয়ে। খুবই সাদামাটা আয়োজনে এক বন্ধুর সহায়তায় শুরু করেন ইউটিউবিং। মাহা ফান টিভি চ্যানেলের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান মিঠুনের এ ছাড়া রয়েছে আরও চারটি চ্যানেল। বলা হচ্ছে, মাহা ফান টিভি ব্যক্তিপর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় ফানি ইউটিউব চ্যানেল।

আরও পড়ুন : নামে ডিজিটাল, সেবা কি ডিজিটাল? 

জানা গেছে, জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা ইউনিয়নের ঈশ্বরদেবোত্তর গ্রামের রজব আলীর চতুর্থ সন্তান মতিউর রহমান। নিয়ামতপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে এসএসসি, নিয়ামতপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১০ সালে এইচএসসি এবং ২০১৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন তিনি।

গ্র্যাজুয়েশন পাস করে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয়কর্মী হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন দিনের পর দিন। সে সময় একটি স্যামসাং জে-২ মডেলের মোবাইল কিনে তার সঙ্গে ফ্রি এমবি পান। সেই এমবি দিয়ে ইউটিউব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। এতে তার ইউটিউবিংয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। বুঝতে থাকেন ইউটিউব থেকে কীভাবে আয় করা যায়।

যেই কথা সেই কাজ। সিদ্ধান্ত নেন ফানি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করার। পরে বন্ধু মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে মিঠুন মনস্থির করেন, মজার মজার ফানি ভিডিও বানাবেন। যাতে কোনো কথা থাকবে না, শুধু অঙ্গভঙ্গি দেখেই মানুষ মজা পাবে।

মতিউর রহমান মিঠুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০১৬ সালে যখন প্রথম এইচডি ফান নামে একটি চ্যানেল চালু করলাম, শুরুতে বন্ধুবান্ধবকে ১০ টাকার এমবি কিনে দিয়ে চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে নিতাম এরপর আস্তে আস্তে ছয় মাসের ভেতরে আমার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ কিন্তু আমাকে মনিটাইজেশন দেয়নি ইউটিউব কর্তৃপক্ষ। সে সময় আমি ইন্ডেক্স কিনে ভিউ সেল করছিলাম। সেখান থেকে কিছু টাকা আয় করেছিলাম।

আরও পড়ুন : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার : বন্ধ করায় কি সমাধান?

২০১৭ সালে এক ব্যক্তি মাহা ফান ভিডিও চ্যানেলটি বিক্রি হবে বলে জানায়। চ্যানেলটি মনিটাইজেশন করা ছিল। তখন আমি আমার বাবাকে বুঝিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে চ্যানেলটি কিনে নিই। এই চ্যানেলের পাশাপাশি আগের চ্যানেলসহ আরও একটি চ্যানেল খুলি। ওই দুটিতেও মনিটাইজেশন পাই। তখন আমি এই মাহা ফান ভিডিও চ্যালেনটি বন্ধ রেখে ওই দুই চ্যানেলে কাজ করি।

দুর্ভাগ্যবশত ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সব ফানি চ্যানেল বন্ধ করে দেয় ইউটিউব। সে সময় মাহা ফান চ্যানেলটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার কারণে এটা আর বন্ধ করেনি কর্তৃপক্ষ। আগের দুটি বন্ধ হওয়ায় পরে আমি মাহা ফান চ্যানেলে ভিডিও দেওয়া শুরু করি। বর্তমানে আমার দুটি চ্যানেল মনিটাইজেশন আসে, একটি হলো মাহা ফান টিভি, আরেকটি বিজি ফান টিভি (Besy fun tv)। যেটার সাবস্ক্রাইবার ১০ মিলিয়ন।

পাড়া-প্রতিবেশী কেউই এ কাজ পছন্দ করত না, এমনটা জানিয়ে মিঠুন বলেন, প্রথম দিকে আমার পরিবারসহ পাড়া-প্রতিবেশী কেউই এ কাজকে পছন্দ করত না। এলাকার সবাই কৃষিকাজ করত। আমাকে ভিডিও বানাতে দেখে সবাই পাগল বলতে শুরু করল। এখন আমার সফলতা দেখে এলাকাবাসী অনেক ভালোবাসে আমাকে। এখন সবার ধারণা পাল্টে গেছে। এখন গ্রামের সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন।

শুরুর অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম যখন ভিডিও কাজ শুরু করি, আমার কিছুই ছিল না। একটা ডাইয়াং ১০০ সিসির গাড়ি ছিল। সেটিতে করে ছেলে-পেলেকে নিয়ে একটি টুল ও একটি গামলা বস্তার ভেতর ভরে বিলের ভেতর দিয়ে কালামারা ব্রিজে চলে যেতাম। মানুষ দেখলে আমাকে পাগল বলে গালি দেবে, তাই ছেলেদের বলতাম যে তোরা এগুলো লুকিয়ে আনবি। বিকেলে ভিডিও করে আবার সন্ধ্যার সময় চলে আসতাম।

মজা থেকে সফলতার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথম দিকে আমরা চারজন মিলে এই কাজগুলো করতাম। ধীরে ধীরে টিম বাড়তে লাগল। এখন আমার দলে ৭০ জনের মতো কাজ করেন। তাদের বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত ভাড়াসহ সব খরচই দিই। পর্যায়ক্রমে কাজের লোকের বেতন সর্বনিম্ন ১০ হাজার এবং যারা অভিনেতা আছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ বেতন ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। সব খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে আয় থাকে প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। 

আরও পড়ুন : বিলিয়ন ডলারে পলিটিকো বিক্রি, আয়ের জোয়ার ভিডিওতে 

বর্তমান প্রতি মাসে গড়ে পাঁচটি ভিডিও আপলোড করেন তিনি। একদল তরুণ ও দুই তরুণীর মজার সব কার্যকলাপের পাঁচ-ছয় মিনিটের এসব ভিডিওতে থাকে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ-ঘাটের চিত্র।

মিঠুনের ম্যানেজার আলমঙ্গীর হোসেন বলেন, তিনি আগে অন্যের গাড়ির চালক ছিলেন। একদিন মিঠুন তাকে পিকআপ চালানোর জন্য নিয়োগ দেন। সেখান থেকেই শুরু আস্তে আস্তে পদোন্নতি পেয়ে এখন তিনি ম্যানেজার হয়েছেন। বর্তমানে এখানে যা বেতন পান, তা দিয়ে খুব সচ্ছলভাবেই পরিবার চালান তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ইচ্ছা আছে এ রকমভাবে ভিডিও তৈরি করে যাব। এখানে শুধু আমার একটাই ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে সবাইকে নিয়ে কাজ করছি আমি। অনেক বেকার ছেলে-মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। একদিন পৃথিবীর বড় ইউটিউব চ্যানেল হবে, এমন স্বপ্ন দেখেন তিনি।

দেলোয়ার হোসেন/এনএ