ঘুমন্ত অসহায়দের গায়ে নিজ হাতে কম্বল দিলেন ডিসি
থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের প্রস্তুতিতে যখন ব্যস্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একাংশ, ঠিক তখনই গভীর রাতে কম্বল নিয়ে বের হলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শীতার্ত অসহায় মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণের উদ্দেশ্যে ডিসি হিলের সরকারি বাসভবন থেকে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বের হন তিনি। তবে শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি জেলা প্রশাসক। নগরীর ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনে তার দৃষ্টি পড়ে শীতার্ত দুই পথশিশু—ঝুমুর ও শাহীনের ওপর। শীতের কনকনে রাতে কাঁপতে থাকা শিশু দুটিকে দেখে থমকে দাঁড়ান তিনি।
সবাইকে বিস্মিত করে একজন আদর্শ বাবার মতো দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তাদের সঙ্গে। পরে নিজ হাতে দুই শিশুর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেন। রাতে কী খেয়েছে জানতে চাইলে ঝুমুর ও শাহীন জানায়, টাকার অভাবে সেদিন তারা কিছুই খেতে পারেনি। বিষয়টি শুনে মানবিক ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের রাতের খাবারের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
বিজ্ঞাপন
শুধু এই দুই পথশিশুই নয়, নগরীর মহসীন কলেজ এলাকায় ফুটপাতে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শারীরিক প্রতিবন্ধী আব্দুল মজিদ এবং তার সাত বছর বয়সী কন্যা ইয়াসমিনের দিকেও নজর যায় আউট অব বক্স কাজের জন্য সারাদেশে আলোচিত এই জেলা প্রশাসকের। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে আসা এই বাবা-মেয়ের আশ্রয় বলতে ফুটপাতে পাতা একটি পাতলা পুরোনো কম্বল। ইয়াসমিনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে জেলা প্রশাসক তার বাবার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নোট করেন এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তাদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসতে অনুরোধ জানান।
বৃহস্পতিবার টেলিফোনে কথা হলে আব্দুল মজিদ জানান, তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। মহসীন কলেজের সামনে বসে ভিক্ষা করে যে অর্থ পান, তা দিয়েই মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে দিনযাপন করেন। প্রতিদিন ৫০ টাকায় আলুভর্তা, ডাল ও ভাত কিনে খেতে হয়। মেয়ের মাছ বা মাংস খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ করতে পারেন না। কোনো কোনো দিন কেউ বেশি সাহায্য করলে মেয়ের জন্য একটু ভালো খাবার কিনে দেন।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় জীবনযাপন করা এই বাবা-মেয়ের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন জেলা প্রশাসক। তিনি আব্দুল মজিদকে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন এবং আগামী বুধবার অফিসে আসতে অনুরোধ জানান।
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমার নিজেরও একটি মেয়ে আছে। শীতার্ত ইয়াসমিনকে দেখে আমার নিজের সন্তানের নিষ্পাপ মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শুধু জেলা প্রশাসক হিসেবে নয়, একজন পিতা হিসেবেও আমার মনে হয়েছে—এই শিশুটির জন্য কিছু করা উচিত।
পথশিশু ঝুমুর ও শাহীন সারারাত না খেয়ে থাকার বিষয়টিও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় বলে জানান তিনি। বলেন, থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে শহরের অনেক মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করবেন, অথচ এই শহরেই কিছু শিশু একবেলা খাবার পায় না—এটা একজন মানুষ হিসেবে আমাকে কষ্ট দেয়।
শীতের এই দুঃসময়ে মানবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মোট ৬০০টি কম্বল বিতরণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে দামপাড়া গরীবউল্লাহ মাজার এলাকা, ষোলশহর রেলস্টেশন, মুরাদপুর, চকবাজার ও চেরাগী পাহাড় মোড়, লালদিঘী এলাকা এবং জেল রোডের আমানত শাহ মাজার এলাকা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নিজে ঘুরে ঘুরে অসহায়, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও বসতবাড়িহীন ভাসমান মানুষের হাতে শীতবস্ত্র তুলে দেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।
এমএএস