যশোরে এক বিএনপি নেতাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের শংকরপুর এলাকার নয়ন কাউন্সিলর অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আলমগীর হোসেন (৫৫) যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার ইসাহাক সড়কের মৃত ইন্তাজ চৌধুরীর ছেলে। তিনি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শংকরপুর এলাকায় নয়ন কাউন্সিলর অফিসের সামনে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীরা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে। গুলিটি তার মাথার বাম পাশে বিদ্ধ হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

বিদায়ী বছরে জেলায় ৭০ হত্যাকাণ্ড

যশোরে ২০২৫ সালে অন্তত ৭০টি হত্যাকাণ্ড, ৭৮টি ধর্ষণ এবং প্রায় তিন হাজারের মতো বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এরমধ্যে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা ধরনের অপরাধে জেলাজুড়ে জনমনে ছিল উদ্বেগ-আতঙ্ক।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও রাজনীতিকসহ প্রায় ৭০ জন খুন ও ৭৮ নারী ধর্ষণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ২০২৫ সাল। এতেই খ্যান্ত নয়, হাজারটি মাদকের মামলা ছাড়া আরও ২২০ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে যশোরে ৩ হাজার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

গত ২২ মে অভয়নগরের ডহর মশিয়াহাটি গ্রামের পিন্টু বিশ্বাসের ঘরে একদল সন্ত্রাসী গুলি চালায়। এ সময় তারা কুপিয়ে ও মাথা থেঁতলে উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলামকে হত্যা করে।

২৩ জুলাই সদর উপজেলার সুজলপুরে ভাইয়ের হাতে বোন শারমিন (২৮) খুন হন। এই ঘটনার মামলায় ভাই খোকন মোল্যা ও ভাবি সালমাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

২৫ মে যশোরে সেলিম রেজা ডাবলু (৪০) নামে এক ইজিবাইক চালককে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকাল ৭টার দিকে সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ব্র্যাক অফিসের সামনে থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত সেলিম রেজা সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামের মৃত আমজেদ হোসেন বিশ্বাসের ছেলে।

৯ অক্টোবর সকালে সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামে চঞ্চল গাজী (২৭) নামে এক যুবককে খুন করা হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।

১০ জুন রাতে শার্শা উপজেলার লক্ষণপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের আজগার আলীর ছেলে লিটনকে বোমা হামলা ও ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। খুন হওয়ার ২০ দিন আগে তিনি জামিনে কারামুক্ত হন। তার বিরুদ্ধে একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলা রয়েছে।

গত ঈদের দিন পাশের ইউনিয়নে ককটেল হামলায় খুন হন বিএনপির কর্মী আব্দুল হাই। এ ছাড়া, ৫ জুন নাভারণে খুন হন সবুজ হোসেন নামের আরেক ব্যক্তি।

৮ মার্চ চৌগাছায় পুত্রের ধারালো দায়ের আঘাতে পিতা শরিফুল ইসলাম (৫০) খুন হন। উপজেলার পাতিবিলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

৭ ডিসেম্বর মধ্য রাতে যশোর শহরে তানভীর হাসান (২৬) নামে এক যুবককে হত্যার ঘটনায় পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। নিহত তানভীর শংকরপুর হাজারীগেট এলাকার মিন্টু মিয়ার ছেলে।

১৫ জুন যশোরের অভয়নগর উপজেলায় কুয়েত ফেরত যুবক হাসান শেখকে (৩০) গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে। ওইদিন সকালে উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের নাউলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি ঘেরের পাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত হাসান শেখ অভয়নগর উপজেলার নাউলি গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। ১৪ আগস্ট কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা গ্রাম থেকে তারেক সরদার (২৪) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

এর আগে, ১৩ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় যুবলীগ কর্মী রেজাউল তরফদারকে (৫৫)।

এ ছাড়া, গত ২১ ডিসেম্বর পান-সুপারি দেওয়ার কথা বলে যশোরের অভয়নগরে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মিন্টু মোল্যা নামে এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী। আটক মিন্টু মোল্যা একই উপজেলার মালাধরা গ্রামের মিজানুর রহমানের ছেলে। একইদিন সদর উপজেলার রায়মানিক কচুয়ায় ৯ বছর বয়সের আরেক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলেও ধর্ষক আটক হয়নি।

১৩ ডিসেম্বর যশোরের রামকৃষ্ণপুরে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ, ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে আত্মহত্যায় বাধ্য হয় স্কুল ছাত্রী নাদিয়া খাতুন। এই ঘটনায় থানায় মামলা হলেও আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত ৩০ জুন সকালে শার্শা উপজেলার কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামে এক গৃহবধূ সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনায় তার স্বামী ৭ জুলাই থানায় মামলা করেন। চৌগাছা পাতিবিলায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে তরিকুল ইসলাম নামে এক বখাটেকে গণধোলাই দিয়েছে স্থানীয় লোকজন। গত ২৩ মার্চ মোবাইলে অশ্লীল ছবি দেখিয়ে তরিকুল ওই শিশুকে ধর্ষণ করে। গত ৩১ অক্টোবর বাঘারপাড়ায় ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে তার দাদা ৫৮ বছরের বৃদ্ধকে আটক করে পুলিশ। গত ১০ আগস্ট ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধাকে ধর্ষণের অভিযোগে সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুরে ১৬ বছরের এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দিয়ে স্থানীয় লোকজন।

গত ১৮ এপ্রিল এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আরেক কলেজছাত্র আফনান তাহসিন স্বপ্নীলকে আটক করে পুলিশ।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার জানান, যশোরের পুলিশ অপরাধীদের ধরতে সব সময় তৎপর রয়েছে। চলতি বছরে যেসব হত্যা, ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো যথাযথ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেক মামলার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। আদালতে সেগুলোর বিচারকার্য চলছে।

নাগরিক অধিকার আন্দোলন যশোরের সমন্বয়ক শেখ মাসুদুজ্জামান বলেন, অপরাধ দমনে শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার নয়, সামাজিক প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া, অপরাধ প্রবণতার ক্ষতিসহ সচেতনামূলক লেখা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করে নৈতিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নতুন বছরে প্রত্যাশা থাকবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রেখে জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করবে প্রশাসন।

রেজওয়ান বাপ্পী/এএমকে