বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম

‘আমরা সাত দিন কেউ খাইনি। কলাগাছের পাতা ও ল্যাট্রিনের পানি খেয়েছি। তিন দিন খাঁড়া (দাঁড়ানো) ছিলাম। ভাত-পানি কিছুই পাইনি। শেষে কলার গাছ চিবিয়ে রস খেয়েছি।’ কথাগুলো বলছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম।

বয়সের ভারে শরীর কাবু হলেও এখনও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তাকে দাগ কাটে। একাত্তরে বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন তিনি। দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য ৯ মাস শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে বিজয় এনেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আবুল হাসেমের বয়স মাত্র ২০ বছর। মাসে দেড়শ টাকা বেতনে আনসারে যুক্ত হয়েছেন সবেমাত্র। সুনামগঞ্জ আনসার ক্যাম্পে পোস্টিং ছিলো তার। তখনই শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ

তিনি বলেন, ‘দেশের মা-বোনের জন্যে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছি।’ আমার স্ত্রী তখন বলেছিলেন, দেশের জন্যে জীবন দিলে ভালা। ছোট দুই ছেলেকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। স্ত্রী-ছেলের জন্যে মন কাঁদলেও দেশমাতৃকার তুলনায় তা কিছুই না। দেশ আমার পরিবার মনে হয়েছে। তাদের মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে সে প্রতিজ্ঞা আমি রেখেছি।’

আবুল হাসেম বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগেই বলেছেন, ‘যার যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে যাবার জন্য।’ আমরাও যা পেয়েছি তা নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছি। ভারত থেকে রাইফল পেয়েছি। ডলুরা শহীদ স্মৃতিসৌধের পাশে দৃষ্টিনন্দন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ঢাকা পোস্টের এ প্রতিবেদকের কাছে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম।

তিনি বলেন, একাত্তর সালে আমরা একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা সবাই এক কাতারে এসে অস্ত্র হাতে শামিল হয়েছিল। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিচ্ছিলেন সহযোদ্ধারা। দাফন করার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় একসঙ্গেও কবর দিতে হয়েছে অনেককে। আবার অনেক ক্ষেত্রে লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

এই অগ্নিঝরা একাত্তরে আমাদের সঙ্গে একজন শহীদের লাশ মর্যাদার সঙ্গে দাফন করার জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি আবুল কালাম ওরফে মধু মিয়া। যুদ্ধে শহীদদের জন্য তিনি কবরের জায়গা খুঁজতে থাকেন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিজের দখলে থাকা সরকারি খাস জায়াগাকেই উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি।

রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ

যুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন জামালগঞ্জের কামলাবাজ গ্রামের মন্তাজ মিয়া। আনসার বাহিনীর এই তরুণ দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার অদম্য বাসনায় যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। বালাট সাব-সেক্টরের এই যোদ্ধা মৃত্যুর আগে মীরেরচর গ্রামের কাঁচা মিয়াকে নিজের পাঞ্জাবি ও চশমা দিয়ে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে যদি আমি মারা যাই তবে বৃদ্ধ মাকে এই দুটো জিনিস দিয়ে দেবেন।’

এর কিছুদিন পরেই সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন মন্তাজ মিয়া। আর শহীদ মন্তাজ মিয়াকে দাফন করেই গোড়াপত্তন হয় ডলুরা শহীদ স্মৃতিসৌধের। পরে মধু মিয়া শহীদ মন্তাজের খবর জানাতে ছুটে যান তার সঙ্গীসাথি নিয়ে।

সীমান্তঘেঁষা এই ডলুরা স্মৃতিসৌধে ঘুমিয়ে আছেন সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হওয়া ৪৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরে ২০০৪ সালে মধু মিয়া মারা গেলে তাকেও সমাহিত করা হয় এই সমাধিতে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাসেমের ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগে। দেশ স্বাধীনের পর তিনি যুক্ত হন কৃষিকাজে। নিজের কিছু জমিতে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা গ্রামের বাসিন্দা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাসিম যখন মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেন তখন তিনি ১৫০ টাকা বেতনে আনসারে চাকরি করতেন।

কীভাবে যুদ্ধে গেলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধে যখন গিয়েছি তখন ২ ছেলে অনেক ছোট। সত্তরের নির্বাচনের পরে শেখ (শেখ মুজিবুর রাহমান) সাহেবকে ধরে নিয়ে গেছে। তখন মেজর মোতালিব আমাদের সব আনসারদের ডেকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন। তিনি বললেন, দেশকে স্বাধীন করতে হবে। এজন্য যুদ্ধ করতে হবে। আমিও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম।

নিজে অনেক সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাসেম। এসবের স্মৃতি তেমন মনে নেই তার। তিনি বলেন, সুরমা ইউনিয়নের বৈষারপার যুদ্ধে আমাদের সঙ্গের ৭ জন মারা যান। মুখোমুখি সে যুদ্ধে আমাদের এক কমান্ডারও মারা যান। পরে আমরা পিছে ব্যাক করেছি। সে যুদ্ধে আমরা প্রায় ১০০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম।

ডলুরা সীমান্ত এলাকা দেখিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাসেম বলেন, এখানে শরণার্থীদের ক্যাম্প ছিলো। ভারত সরকার তাদের থাকার মতো ঘর তৈরি করে দিয়েছিল। শরণার্থীদের খাবার জন্য রেশন পাঠাতো ভারত সরকার। এই ক্যাম্পের পাশেই আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল।

এই ডলুরা সীমান্তে টিলার ওপরে আমাদের ক্যাম্প ছিলো। ক্যাম্প থেকেই আমাদের খাবার দেওয়া হতো। আমরা গ্রামে গ্রামে থাকতাম। এই এলাকায় কোনো মানুষ ছিলো না। সবাই শরণার্থী ক্যাম্পে চলে গেছে। বাড়িঘর খালি পড়ে রয়েছে। তবে কিছু মানুষ যারা বাড়িঘরে থেকে গিয়েছিল তারা আমাদের খাবার দিয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন। আমাদের গ্রামের একজন নারী এখনও বেঁচে আছেন, যিনি প্রায়ই আমাদের রান্না করে খাওয়াতেন।
  
দেশ স্বাধীনের পর প্রাপ্তি

তিনি বলেন, প্রথমে আমাদের ৩০০ টাকা ভাতা দেওয়া হতো। পরে এটাকে বাড়ানো হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আমাদের যাদের ঘর নেই তাদের ঘর তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

আমরা যুদ্ধ শেষে যে বেঁচে ফিরব সে কথা ভাবিনি কখনও। এখনও অনেক মানুষের কবর পায় না স্বজনেরা। আমার সাথের একজন পায়ে গুলি খেয়েছেন। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। লক্ষণশ্রীর একজন আছেন হাসিম। তিনিও বেঁচে আছেন। স্বাধীন দেশ আমাদের জন্য যা করছে, তাতে আমরা খুশি।

এমএসআর